চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন আন্দোলনকারী। দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা পর প্রশাসনের আশ্বাসে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের অবরোধ প্রত্যাহার করে আন্দোলনকারীরা। তবে আগামী ৭ দিনের মধ্যে এ মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণের দৃশ্যমান কিছু না হলে ফের আন্দোলনের ঘোষনা দেন তারা।
রোববার (৩০ নভেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলায় এবং দুপুর ১টার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়ায় মহাসড়ক ব্লকেড তুলে নেওয়া হয়।
এর আগে সকাল ৯টার দিকে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া এবং সকাল ১০টা থেকে চকরিয়ায় মহাসড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে মহাসড়কটির একাধিক স্থানে অবরোধ করা হয়। এতে দীর্ঘ যানজট দেখা দেওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন কক্সবাজারমুখী পর্যটক ও যাত্রীরা।
রোববার সকাল ১০টায়। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার মাতামুহুরী সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেতুটির দু’পাশে রশি দিয়ে দেয়া ব্যারিকেড। আর সেতুতে ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে অবস্থান করে চলে মিছিল ও বিক্ষোভ। স্লোগানে স্লোগানে সড়কের একপাশ থেকে অন্য পাশে চলে মিছিল। শুধুমাত্র অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া যেতে দেয়া হচ্ছে না কোন যানবাবাহনকে। আন্দোলনকারীদের দাবি- আর কোন তালবাহানা নয়; চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করতে হবে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ১৫০ কিলোমিটারের মহাসড়কটি দুই লেনের। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পর্যটন নগর কক্সবাজারের কারণে এই সড়কে সব সময় যানবাহনের চাপ থাকে। ফলে প্রতিদিনই দীর্ঘ যানজটে পড়তে হয় যাত্রীদের। এ ছাড়া সরু মহাসড়ক হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
আন্দোলনকারী রফিক আহমদ বলেন, ‘প্রতিদিন নানা কারণেই এই সড়ক দিয়ে আসা যাওয়া। প্রায়শ শুনতে পায় ২-৩টা সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। আমরা এই মহাসড়কে জীবন নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। আমরা যে আবার ঘরে ফিরব এটার কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই ছয়লেনের দাবিতে আন্দোলন করছি।’
ইয়াছিন আরাফাত বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যে পরিমাণ ৩ চাকার গাড়ি রয়েছে; তা বাংলাদেশের আর কোন মহাসড়কে আছে কিনা সন্দেহ রয়েছে। এই ৩ চাকার গাড়ির কারণে তো দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। এগুলো তো মহাসড়ক থেকে দূর করতে পারছে না প্রশাসন। এখন কাকে দোষ দেবেন?’
চকরিয়ার এলাকার বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি খুবই সরু। কিছু দূর পরপর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক। লবণবোঝাই ট্রাক আর ৩ চাকার গাড়িগুলোর চলাচল বেশি। যার কারণে এই মহাসড়কে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে।’
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বাস চালক রহিম উদ্দিন বলেন, ‘কক্সবাজার একটি পর্যটন নগরী। বাংলাদেশের সকল এলাকার মানুষ এখানে যাতায়াত। কিন্তু রাস্তা ছোট, যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি। তার ওপর ৩ চাকার দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। এসব কারণে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে।’
এদিকে অবরোধের কারণে চকরিয়ায় মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যানজট দেখা গেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েন পর্যটকসহ যাত্রীরা। অনেকে পায়ে হেটে রওনা দেন অবরোধের অংশ। কিন্তু এতো দুর্ভোগের পরও তারাও বলছেন, দ্রুত ৬ লেনে উন্নীত করা হোক এই মহাসড়ক।
এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন আন্দোলনকারীদের সরে যেতে অনুরোধ করলেও দাবি পূরণের ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সরবেন না বলে জানান তারা। পরে দুপুর ১টার দিকে প্রশাসনের আশ্বাসে আন্দোলনকারীরা মহাসড়ক থেকে সরে যান। এরপর স্বাভাবিক হতে থাকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের যানযাহন চলাচল।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন আন্দোলনের সমন্বয়ক ইব্রাহীম ফারুক ছিদ্দিকী বলেন, প্রশাসনের আশ^াসে আমরা অবরোধ তুলে নিয়েছি। কিন্তু আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা না নিলে ফের আন্দোলনে নামবো আমরা। তখন অবরোধ আরও কঠোরভাবে পালন করা হবে। আমরা চাই, দ্রুত সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি যেন ৬ লেনে উন্নীতকরণের ব্যবস্থা নেয় সরকার।
চকরিয়ার ইউএনও মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। এখন ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রণয়নের কাজ চলছে। আন্দোলনকারীদের তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন।
চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার অভিজিত দাস বলেন, অবরোধের কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা পর আন্দোলনকারীরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে দ্রুত মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
এদিকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে লোহাগাড়ার আমিরাবাদ স্টেশনে মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে ছয় লেনের দাবিতে নানা স্লোগান দিচ্ছেন অবরোধকারী ব্যক্তিরা। এ সময় মহাসড়কের উভয়পাশে দীর্ঘ এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজট দেখা গেছে।
লোহাগাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের আশ্বাসে দুপুর ১২টার দিকে লোহাগাড়া থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করেছেন আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা।
সাতকানিয়ার ইউএনও খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, মহাসড়কটি সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া চলমান। এটি দরপত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। আন্দোলনকারীদের কাছে এই তথ্য ছিল না। এটা জানার পর তারা কেরানীহাট থেকে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের গেল ১১ মাসে এ মহাসড়কে ১৫৫টি দূর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫০ জন আর আহত হয়েছেন ৩৫১ জন। এসব দুর্ঘটনার পেছনে অপ্রশস্ত সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, বেপরোয়া গতি, লবণাক্ততার কারণে পিচ্ছিল সড়ক, অবৈধ যানবাহন চলাচল ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।