মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির চিঠি পেয়ে অবগত হলাম যে আমাকে নবাগত ১৬৬ জন আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রশিক্ষক মনোনীত করা হয়েছে এবং ৫ অক্টোবর,২০২৬ সন্ধ্যা ৬.৪৫ টা থেকে ৭.১৫ টা পর্যন্ত আমাকে আইনজীবীদের আচরণবিধি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রশিক্ষক হিসেবে আরো আছেন,অতিরিক্ত জেলা জজ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম,অতিরিক্ত জেলা জজ মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী,এডভোকেট শিবুলাল দেব দাস,এডভোকেট শামশুল হুদা ও এডভোকেট সাজ্জাদুল করিম। আমি তিনবার ( ১৯৯১,১৯৯৫,১৯৯৬) কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলাম। এখন সমিতির সদস্য হিসেবে আইনজীবী সমিতির সকল সিদ্ধান্ত শ্রদ্ধার সাথে মান্য করা উচিত বিধায় নির্ধারিত সময়ের আগেই আমি ইসলামিক ফাউন্ডেশন কনফারেন্স রুম (নবনির্মিত কক্সবাজার কেন্দ্রীয় মডেল জামে মসজিদ প্রাঙ্গন) উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাই সাড়ে সাত টার সময়। নবাগত আইনজীবীদের স্বাগতম জানিয়ে প্রথমেই বলি আমি লিখিতভাবে আইনজীবীদের শপথ ও আচরণবিধি সম্পর্কে ৪পৃষ্টার একটি লেখা ইতিমধ্যেই আপনাদের হাতে পৌছে দিয়েছি। পেশাগতভাবে কেবলমাত্র আইনজীবীদেরকেই ’বিজ্ঞ’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়। তাই আইনজীবীদের কাজে-কর্মে-আচরণে বিজ্ঞতার ছাপ থাকা আবশ্যক। এই বার ১৬৬ জন নতুন আইনজীবী কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতিতে যোগদান করেছেন। প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতে উকালতি করতে গেলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকর্তৃক স্বীকৃত যে কোন আইনজীবী সমিতির সদস্য হতে হবে। তবে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী দল, আওয়ামী আইনজীবী লীগ, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ, ইসলামী আইনজীবী পরিষদ, বাংলাদেশ আইনজীবী কাউন্সিল ইত্যাদি হরেক নামের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গঠিত সংঘটনের সদস্য হওয়ার প্রয়োজন নেই। উক্ত দলীয় সংঘটনগুলোর সদস্য হওয়া আইনতঃ বাধ্যতামূলক নয়। বরং আইনজীবীদের মধ্যে দলীয়করণ বা আইনজীবীরা রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হওয়া বাংলাদেশের বৃহত্তর আইনজীবী সমাজের ঐক্যের বুকে কুঠারাঘাত করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী আইন আদালতের ভাবমূর্তি, নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কোন কোন সময় প্রশ্নের সম্মূখিন হয় কেবলমাত্র আইনতঃ অপ্রয়োজনীয় রাজনীতিকরণ ও দলীয়করণের প্রভাবে করা কাজের কারণে। একজন আইনজীবীর নাগরিক হিসেবে যে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য বা নেতা হওয়ার অধিকার থাকলেও আদালতে ও আইনজীবী সমিতিতে সকল রাজনীতির উর্ধ্বে একজন পূর্ণাংগ আইনজীবী হওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ বলে নিরপেক্ষ প্রকৃত আইনজীবীদের অভিমত। এতে করে জনসমক্ষে ও আদালতের কাছে আইনজীবী হিসেবে যোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। কথিত স্বৈরাচার এরশাদ সরকার যখন মন্ত্রীত্ব দিয়ে, বিভিন্ন আর্থিক, বৈষয়িক, লাভজনক সুবিধাদি দিয়ে ছলে বলে কৌশলে রাজনীতিবিদদের প্রায় নিঃস্ক্রিয় করে রেখেছিল তখন তাকে ক্ষমতাচ্যুৎ করার কার্যকর আন্দোলন শুরু করেছিলেন দেশের ঐক্যবদ্ধ আইনজীবীরা। সকল রাজনৈতিক দলের আইনজীবী নেতারা বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট শামসুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনে শরীক তিন জোটের নেতারাও আইনজীবীদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিতেন, দেশবাসীও শ্রদ্ধার সাথে মান্য করতেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আইনজীবীরা ভোট দিয়ে এডভোকেট শামসুল হক চৌধুরীকে ১৯৮৩ থেকে ’৮৯ সাল পর্যন্ত লাগাতার ছয়বার বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত করেছিলেন। বিগত ৩/২/১৯৭৯খ্রিঃ তারিখ আমি,এডভোকেট আবুল কালাম ছিদ্দিকী,এডভোকেট দিল মোহাম্মদ চৌধুরী,মরহুম এডভোকেট আমজাদ হোসেন ও মরহুম এডভোকেট মোহাম্মদ শাহজাহান বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে এডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে কক্সবাজার মহকুমা আইনজীবী সমিতির সদস্য হয়েছিলাম। আমরা ৫ জন টিনের ছাউনীর, উত্তর দিকে ও দক্ষিণ দিকে বারান্দাসহ সেমি-পাকা আইনজীবী সমিতি ভবনে যোগদান করেছিলাম। তখন সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ জন। এখন কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি তিনটা অত্যাধুনিক বহুতল ভবনের মালিক, তালিকাভুক্ত সদস্য সংখ্যা বার শতের অধিক। সকলে জজ কোর্টের আইনজীবী। এখন জেলা আইনজীবী সমিতির লাইব্রেরীতে প্রচুর বই আছে। আমাদের দায়িত্ব হবে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করে আইনানুগভাবে আদালতকে ন্যায় বিচার করতে সহায়তা করা এবং বিচারপ্রার্থী জনগণকে ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে আইনী সহায়তা দেওয়া। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হলে আইনের বই ও মামলার সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বেশী করে পড়তে হবে। এই পেশায় পড়ার কোন বিকল্প নাই। বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসহ আইনের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে বার কাউন্সিল কর্তৃক আয়োজিত একাধিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে আপনারা এডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। সিলেবাসে থাকুক বা না থাকুক বাস্তবে আইন পেশা শুরু করতে গেলে প্রথম দিন থেকে অবশ্যই একজন আইনজীবী হিসেবে নিজের শপথ ও আচরণবিধি সম্পর্কে জানতে হবে এবং সব সময় স্মরণ রাখতে হবে। ’দি বাংলাদেশ লিগেল প্র্যাকটিশনারস এন্ড বার কাউন্সিল অর্ডার এন্ড রুলস, ১৯৭২ এবং ক্যাননস অব প্রফেশনাল কনডাক্ট এন্ড এটিকেট’ (The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order,1972, The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Rules,1972, Canons of Professional Conduct and Etiquette) বইটি অবশ্যই পড়তে হবে। ১৯৭২ সালের রুলস এর ৬২(২) অনুচ্ছেদে ইংরেজীতে এডভোকেটের শপথনামা আছে যা বাংলায় অনুবাদ করলে হবে, ” আমি.......... সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ করিতেছি যে, আইনজীবীরূপে আমি আমার পেশার সুউচ্চ মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখিব; একই সঙ্গে আত্মমর্যাদাবোধ ও এই পেশার প্রতি যথাযথ নিষ্ঠাবান থাকিব এবং পেশাদারী আচরণ ও নৈতিক মানদন্ড অনুসরণ করিয়া চলিব। সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানকে আমার পবিত্র কর্তব্য মনে করিব এবং বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ ইহার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখিতে সচেষ্ট হইব। সংবিধানের পরিপন্থী কোন কর্মকান্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করিব না। মানবাধিকার রক্ষায় আমি হইব একজন সদাপ্রহরী এবং এমন একটি সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখিব যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার সুনিশ্চিত হইবে।”
বিজ্ঞ এডভোকেটদের ’বিজ্ঞতার’ ছাপ সব সময় দৃশ্যমান করে আদালত এবং সংশ্লিষ্ট জনগণের আস্থা ও সম্মান অর্জন করার জন্য আইনে নির্ধারিত মোট ৪২দফা আচরণবিধি অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। এডভোকেটদের আচরণবিধি হিসেবে অধ্যায়-১ এ আইনজীবীদের প্রতি আচরণ ১-১১ দফা, অধ্যায়-২ এ মক্কেলের প্রতি আচরণ ১-১৪ দফা, অধ্যায়-৩ এ আদালতের প্রতি কর্তব্য ১-৯ দফা ও অধ্যায়-৪ এ জনগণের প্রতি আচরণ ১-৮ দফা বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে ইদানিং উক্ত আচরণবিধি সম্পর্কে অনেক আইনজীবীই জ্ঞাত নন বা জ্ঞাত হলেও শ্রদ্ধাশীল নন বা যথাযথভাবে অনুসরণ করেন না। যদিও উল্লেখিত আচরণবিধি প্রত্যেক এডভোকেটের জন্য জ্ঞাত থাকা ও মেনে চলা একান্ত বাধ্যতামূলক। আচরণবিধির যে কোন ধারা অমান্য বা লংঘন করলে তা পেশাগত অসদাচরণ ( চৎড়ভবংংরড়হধষ গরংপড়হফঁপঃ ) বলে গণ্য হবে, যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করা হলে ট্রাইব্যুনাল গঠন পূর্বক পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগের বিচার করা হয় ও দোষী সাব্যস্থ আইনজীবীকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বা চিরকালের জন্য আইন পেশা থেকে বহিস্কারের মত কঠোর শাস্তি দেওয়ার বিধান আছে। সেই সংক্রান্ত আইনজীবীকে শাস্তি দেওয়ার সংবাদ প্রায় সময় সংবাদপত্রে দেখা যায়, যা খুবই দুঃখজনক। তারপরও দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারকের সাথে বা আইনজীবীদের নিজেদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত যে ঘটনাগুলোর সংবাদ সংবাদপত্রে দেখা যায় তার মূল কারণ হল উগ্র দলীয়করণ, প্রতিপক্ষের প্রতি চরম শ্রদ্ধাহীনতা ও মারাত্মক ঘৃণা। আইন আদালত ও আইনজীবীদের পূর্ব সুনাম বা উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে হলে আইনজীবীসহ সকলকে আচরণবিধি তথা আইন মান্য করতে বাধ্য করা ও আদালতাংগণে সর্মসম্মতিক্রমে রাজনীতি, রাজনীতিকরণ বা দলীয়করণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে । আইনজীবী হিসেবে আমাদের সব সময় দেশের সংবিধান,আমাদের শপথ,আচরণবিধি ও প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আদালতকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা এবং আদালতাংগণে রাজনৈতিক কার্মকান্ড চালানোর প্রবণতা দেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণার পরিপন্থী। আমি আইনজীবী হিসেবে আজকের অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধক সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্নার ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন সাহেবের ওয়ান-ইলেভেটের সময় মামলা পরিচালনা করেছি। মহেষখালী তিন শিবিরকর্মী হত্যায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশকর্তৃক দায়েরকৃত মিথ্যা হত্যা মামলায় আসামী নির্দোষ আলেমওলামা,জামাত নেতাদের পক্ষে পুলিশ সাক্ষীদের জেরা করেছি। আমি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি জাফর আলম ও বদির পক্ষেও তারা বিরোধী দলের নেতা ও কারাগারে থাকা অবস্থায় মামলা পরিচালনা করেছি। দলকানা না হয়ে বিপদের দিনে সকল দলের নেতাদের আইনী সেবা দিতে পারার মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তি ও মানসিক শান্তি আছে। আমি মাথায় ও বিবেকে সম্পূর্ণ আইনজীবী। অর্ধেক আইনজীবী, আর অর্ধেক বিএনপি, জামাত, আওয়ামী লীগ বা অন্য দল নই। আমি খন্ডিত আইনজীবী নই, পুর্ণাঙ্গ আইনজীবী। আপনারা আমার মত পুর্ণাঙ্গ আইনজীবী হবেন, নাকি খন্ডিত আইনজীবী হবেন বলে প্রশ্ন করার সাথে সাথে উপস্থিত সকল নবাগত আইনজীবী দাড়িঁয়ে হাত তালি দিয়ে ঘোষণা করেন, ’আমরাও পুর্ণাঙ্গ আইনজীবী হব’। আলহামদুলিল্লাহ। এই স্মরণীয় কর্মশালায় নবীন আইনজীবীদের ঘোষণায় আমি আশাবাদী হলাম বাংলাদেশের আইন আদালত আবার সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ, রাজনীতিমুক্ত, প্রভাবমুক্ত ও মানুষের আশা ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল হবে ইনশাল্লাহ।