পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ফুটবল সমর্থনের চিত্রে দেখা যাচ্ছে নতুন সমীকরণ। একসময় যেখানে ব্রাজিল সমর্থকদের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট, সেখানে এখন আর্জেন্টিনা ভক্তদের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ছে। সেই জনপ্রিয়তার শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে টেকনাফে। শুক্রবার (০৫ জুন) বিকেলে ৫ শতাধিক মোটরসাইকেলের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নিয়ে টেকনাফ শহর ও মেরিন ড্রাইভ প্রদক্ষিণ করেন আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা। পরে সমুদ্রসৈকতের বালুচরে ১০০ ফুট দীর্ঘ আর্জেন্টিনার পতাকা উড়িয়ে প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা ও সমর্থনের জানান দেন তারা।
সমর্থকদের প্রত্যাশা, ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের গৌরবগাথার পুনরাবৃত্তি ঘটবে ২০২৬ সালেও। তাদের বিশ্বাস, মেসির নেতৃত্বে আবারও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ ট্রফি উঠবে আর্জেন্টিনার হাতে।
এমন পাগলামি কেবল আর্জেন্টাইন ফুটবল ভক্তদের পক্ষেই সম্ভব। ক’দিন আগে ৫০০ মোটর সাইকেল নিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন ব্রাজিল ফুটবল ভক্তরা। সেটাকে টেক্কা দিতেই কক্সবাজারের টেকনাফে মেসি ভক্তদের এই মহাসমারোহ। শোভাযাত্রাটি টেকনাফ স্থলবন্দর এলাকা থেকে শুরু হয়ে দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভ প্রদক্ষিণ করে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে। পুরো পথজুড়ে ছিল সমর্থকদের স্লোগান, উচ্ছ্বাস আর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।
আর্জেন্টিনার পতাকা, জার্সি ও নানা রঙের ব্যানারে সজ্জিত পাঁচ শতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে সমর্থকদের এমন বর্ণিল আয়োজনে খোদ ম্যারাডোনার দেশে হয়েছে কি’না কে জানে। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে বাংলাদেশ ঠিকই করেছে। কারণ আর্জেন্টিনা নামটাই যে ভক্তদের কাছে বাড়তি আবেগ আর ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। যে ভালোবাসার খবর পৌঁছে যায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দুরে থাকা লিওনেল মেসির শহরেও।
আর্জেন্টিনার সমর্থক ইব্রাহীম বলেন, “আজকে টেকনাফে যা হয়েছে, সেটা যেন আমাদের জন্য ছোটখাটো ঈদের মতো। ঈদের মাঝেও এমন রেকর্ড পরিমাণ আর্জেন্টিনা সমর্থক আগে কখনো দেখা যায়নি। দোকানপাট বন্ধ রেখে, কাজকর্ম ফেলে হাজার হাজার মানুষ এখানে এসে জড়ো হয়েছে শুধু প্রিয় দল আর্জেন্টিনাকে সমর্থন জানাতে। আমাদের ধারণা, ৫০০-এর বেশি মোটরসাইকেলসহ প্রায় ২-৩ হাজার মানুষ এই উদযাপনে অংশ নিয়েছে।”
আরেক সমর্থক রহিম উল্লাহ বলেন, “আমরা মাঠে এবং মাঠের বাইরে সবসময়ই আর্জেন্টিনার পাশে আছি। আমাদের প্রিয় দল, মেসি-নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী দল। গতবারের মতো এবারও তারা সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমরা চাই তারা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে যে অবস্থান অর্জন করেছে, সেটি ধরে রেখে আবারও বিশ্বসেরা হোক।”
আর্জেন্টিনার সমর্থক সরওয়ার আলম বলেন, “আজকের পরিবেশটা পুরোপুরি উৎসবমুখর। টেকনাফজুড়ে হাজার হাজার মানুষ একসাথে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে উচ্ছ্বাস করছে। সবাই খুব আনন্দে আছে, কোনো ধরনের বড় ইনজুরির খবরও এখনো পাওয়া যায়নি-সব খেলোয়াড়ই ভালো ফর্মে আছে। আমরা আশাবাদী, ইনশাআল্লাহ এবারও আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল পার করে চ্যাম্পিয়ন হবে। আমরা সবাই একসাথে মিলে সেই জয় উদযাপন করব।”
আর্জেন্টাইন ভক্তদের বিশাল এই র্যালি ছাড়াও বিশেষ আকর্ষণ ছিলো ১০০ ফুট পতাকার বিশেষ প্রদর্শণী। টেকনাফ সমুদ্র সৈকতের বালিয়াড়িতে তারা ফিরিয়ে আনে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের সুখস্মৃতি। ভক্তদের বিশ্বাস ইতিহাস বিপক্ষে থকলেও আবারো বিশ্বজয়ের পূনরাবৃত্তি মার্কিন মুলুকেই ঘটাবেন লিওনেল মেসিরা।
আয়োজকদের একজন নোমান বলেন, “২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমাদের বিশ্বাস, আগামী বিশ্বকাপ হবে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ, আর সেখানেও আবারও শিরোপা জিতবে আর্জেন্টিনা। প্রত্যাশা একটাই, “তিন স্টার” অর্জনের পথে দল আরও একবার ইতিহাস গড়বে।
আয়োজকদের আরেকজন আব্দু রহমান বলেন, টেকনাফে আয়োজিত র্যালি ও কনসার্টে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দই তুলে ধরা হয়েছে। আশা করছি, ২০২২ সালের পারফরম্যান্স ধরে রেখে দল আবারও চ্যাম্পিয়ন হবে। পরিকল্পনা ও দলের প্রস্তুতির ওপর আস্থা রেখে আমরা বিশ্বাস করি, আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বসেরার মঞ্চে উঠবে।
আয়োজক হেলাল উদ্দিন বলেন, “খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য এবং ইতিবাচক বিনোদনের পরিবেশ গড়ে তোলাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।”
এদিকে, বর্ণাঢ্য বাইক শোভাযাত্রার পর আয়োজন করা হয় জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্ট। প্রাণবন্ত পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। গান, উচ্ছ্বাস আর ফুটবলপ্রেমে মেতে ওঠা দর্শনার্থীরা উপভোগ করেন এক আনন্দঘন ও স্মরণীয় বিকেল।