মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট
সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় গত ১৭ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সংবাদপত্র সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের নেতারা বৈঠক করেছেন এবং তাঁর হাতে ২৯৪ জন সাংবাদিকের তালিকা দিয়েছেন। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ও নোয়াব এর সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী কালেরকন্ঠে লিখেছেন মামলাগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মামলাগুলো আমাদের সময় হয়নি, উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া গেছে। হত্যা মামলাগুলো রিভিউ করা হবে। হয়রানিমূলক মামলাগুলো ফরমালি প্রত্যাহার করা হবে।
৪ জুন আমাদের সময় পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলা হয়েছে মোট ১ হাজার ৮৬২টি, চার্জশিট হয়েছে ১৯০টি, সাক্ষীর অভাবে তদন্ত ঝুলে আছে ১ হাজার ৬২৫টি। ৭৯৯টি হত্যা মামলার মধ্যে চার্জশিট হয়েছে ৬০টি।
সাক্ষীর অভাবে তদন্ত ঝুলে থাকা ১,৬২৫টি মামলার মধ্যে কক্সবাজার জেলার একটি মামলাকে উদাহারণ হিসেবে নিয়ে নিরপেক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট আইনী বিষয়গুলি সম্পর্কে আলোচনা করা যায়। কক্সবাজার সদর মডেল থানায় গত ৪/৮/২০২৪খ্রিঃ তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক ৬.৩০ টা থেকে ৮.০০ টা পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের লালদীঘির পাড় থেকে শহীদ মিনার, গুমগাছ তলা হতে হকশন ও আশেপাশের উপ-সড়কে হওয়া ঘটনার জন্য গত ২১/৩/২০২৫খ্রিঃ তারিখ চট্টগ্রাম জেলার বাশঁখালী থানার স্থায়ী অধিবাসী, কক্সবাজার সদর থানার ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ মুহুরীপাড়ায় বসবাসকারী ও নিজেকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, কক্সবাজার জেলার ছাত্র প্রতিনিধি বলে উল্লেখ করে কক্সবাজার জেলার ৫২০ জন আসামীর নাম উল্লেখ করে আরো ২০০/২৫০জন অজ্ঞাত আসামী করে ঘটনার ৭ মাস ১৭ দিন বিলম্বে একটি লিখিত এজাহার দায়ের করলে দন্ডবিধির ১৪৩/৩২৩/৩২৪/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৫০৬/১০৯/১১৪ ধারায়, তৎসহ বিস্ফোরক আইনের ৩ ও ৪ ধারায় কক্সবাজার থানার মামলা নং ৪৯ তারিখ ২১ মার্চ ২০২৫ রুজু করে তদন্ত শুরু করা হয়। উক্ত মামলায় অনেক এজাহারনামীয় আসামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অনেক এজাহারবর্হিভুত আসামীকেও গ্রেপ্তার করে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামীদের প্রায় সকলে আদালত থেকে, জজ আদালত বা হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি লাভ করেছেন। উল্লেখ প্রয়োজন কক্সবাজার পৌরসভার পাশের ইউনিয়ন খুরুস্কুলের অধিবাসী এজাহারের ১৬৪ নম্বর আসামী এহছান উল্লাহকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে প্রেরণ করলে তার জামিনাবেদন নামজ্ঞুর করে হাজতে প্রেরণ করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া হাজতী আসামী এহছান উল্লাহ নিজে একজন নির্বাচিত ইউপি মেম্বার এবং তিনি একজন সাবেক পিপি ও একজন বর্তমান এপিপি সহ প্রায় ১০/১২ জন আইনজীবীর ঘনিষ্ট আত্মীয় হওয়ায় তার জামিনের জন্য দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারী মিচ মামলা দায়ের করা হয়। মিচ মামলা শুনানীর সময় আদালতে উপস্থিত আইনজীবীদের মধ্যে আমি সকলের সিনিয়র হিসেবে আমাকে শুনানী করার জন্য নিয়োজিত আইনজীবীরা অনুরোধ করায় আমি শুনানী করেছিলাম ও জামিন মঞ্জুর হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য যে, ওই দিন মামলার সংবাদদাতা দায়রা জজ আদালতের ডকে স্বেচ্ছায় উপস্থিত হয়ে আসামীকে জামিন দিতে তার আপত্তি নাই বলেছিলেন। আমি উৎসাহী হয়ে আসামীর আত্মীয় আইনজীবীদের কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলাম সংবাদদাতা/বাদীকে কিভাবে চট্টগ্রাম থেকে আনা সম্ভব হয়েছে। তারা আমাকে জানিয়েছেন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে । শুনেছি বাদী আসামীদের জামিনে মুক্তি পেতে সহায়তা করতে অনেকের জন্য ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতেও উপস্থিত হয়েছিলেন। ঘটনার অস্বাভাবিক ৭মাস ১৭দিন বিলম্বে দায়েরকৃত মামলার তদন্ত এখনও সমাপ্ত হয় নাই বলে জানা যায়, যদিও ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭(৫) ধারার বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ চার মাসের মধ্যে মামলার তদন্ত সমাপ্ত করার আইনী নির্দেশনা রয়েছে। কথিত স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের আমলে ১৯৮২ সালে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭ ধারার ৫ উপধারা সংযোজন করে ২মাসের মধ্যে মামলার তদন্ত সমাপ্ত করতে ব্যর্থ হলে অধিকতর তদন্তের জন্য আরো ১মাস বৃদ্ধি করতে পারতেন সংশ্লিষ্ট কগনিজেন্স গ্রহনকারী ম্যাজিষ্ট্রেট। নির্ধারিত সময় ও বর্ধিত সময়ের মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করতে ব্যর্থ হলে আসামী হাজতে থাকলে তদন্ত বন্ধ করে আসামীকে মুক্তি দেওয়া হত। পরে নির্বাচিত সরকারের আমলে তা সংশোধন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করতে না পারলে আসামীকে মুক্তি দেওয়ার পরিবর্তে জামিনে মুক্তি দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। এখনও প্রচলিত আইনে ৪ মাসের মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করতে ব্যর্থ হলে জামিনে মুক্তি দেওয়ার বিধান আছে। কক্সবাজার সদর থানার উল্লেখিত মামলাটি রুজু হওয়ার পর প্রায় ১৬ মাস অতিক্রান্ত হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তকার্য সমাপ্ত করে অভিযোগপত্র বা চুড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তভার পাওয়ার পর বাদীর দেখানোমতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন, ঘটনাস্থল থেকে আলামত জব্দ করবেন, বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন, যদি বাদী নতুন কিছু বলেন তার জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করবেন, উপস্থিত সাক্ষীদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করবেন। আসামীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করবেন এবং বাদীকে তার মামলার সাক্ষী হাজির করানোর নির্দেশ দেবেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতি ৭ দিন পরপর ৩ বার বাদীর বরাবরে তার এজাহারের অভিযোগ প্রমাণের জন্য সাক্ষী হাজির করার লিখিত নোটিশ দেওয়ার পরও সাক্ষী আনতে ব্যর্থ হলে মামলার তদন্ত বছরের পর বছর বা অনির্দিষ্ট কালের জন্য ঝুলিয়ে না রেখে তদন্তকারী কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে আসামীদের অব্যাহতির আবেদন করতে পারেন। ভবিষ্যতে বাদী সাক্ষী আনতে পারলে বা সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে আসামীদের বিরুদ্ধে তদন্ত পুনরায় শুরু করে অভিযোগপত্র দিতে আইনতঃ কোন বাধা নাই। বাদী মামলা বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন তা প্রমাণ হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সংবাদদাতা/বাদীর বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ২১১ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়ের করার অভিযোগে বিচারের সম্মুখিন করার জন্য ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য সাক্ষীর অভাবে মামলার তদন্ত ঝুলিয়ে রেখে মামলাজট বৃদ্ধি করে শত শত আসামীকে হয়রানী করা ন্যায় বিচার পরিপন্থী ও প্রচলিত আইন তা সমর্থন করে না। আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সমাপ্ত করে দোষী আসামীদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে বিচারের মাধ্যমে আসামীদের আদালতকর্তৃক উপযুক্ত দন্ডাদেশ প্রদান করা হবে, তা প্রত্যাশিত।
সাংবাদিকদের মামলার তদন্ত ও বিচারের জন্য দেশে ভিন্ন কোন আইন প্রচলিত নাই। সাংবাদিকরা কথাবার্তা, লেখালেখির মাধ্যমে পতিত সরকার বা সরকার প্রধান শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হওয়ার জন্য উৎসাহিত করলে, তারা সরকার থেকে অবৈধ সুযোগ সুবিধা নিয়ে শত কোটি টাকার মালিক হয়ে প্রচলিত আইন ভঙ্গ করে অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। মামলার তদন্ত আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাপ্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। আদালতে বিচারে সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে দোষী সাব্যস্থ হলে তাদের করা অপরাধের জন্য দন্ডিত হবেন। কিন্তু আসামী হওয়া সাংবাদিকদের করা অপরাধের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে মামলা না করে হত্যা মামলা, হত্যা প্রচেষ্টার ইত্যাদি মামলায় আসামী করে গ্রেপ্তার করে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিনা বিচারে হাজতে আটক রাখা প্রচলিত আইনের চরম লংঘন, মানবাধিকার ও ন্যায় বিচার পরিপন্থী। সুতরাং সাংবাদিকদের মামলা বিনা বিচারে প্রত্যাহার না করে তদন্ত সমাপ্ত করার আইনে নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়া মামলাগুলির তদন্ত দ্রুত সমাপ্ত করে তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে অভিযোগপত্র দাখিল বা সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া না গেলে অব্যাহতির ব্যবস্থা করাই ন্যায় বিচারের পক্ষে সহায়ক হবে। আইনানুগভাবে সময় মত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মামলার তদন্ত কার্যক্রম থেকে প্রত্যাহার করে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। এতে করে দেশে হস্তক্ষেপমুক্ত আইনের শাসন, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভের ভিত্তি সুনিশ্চিতভাবে মজবুত হবে।