ঈদের টানা সাত দিনের দীর্ঘ ছুটি সামনে রেখে সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল নামার অপেক্ষা।
সৈকতজুড়ে এখন যেন ব্যস্ততার শেষ নেই। জেট স্কি চালক, বিচ বাইক মালিক, ঘোড়াওয়ালা, ফটোগ্রাফার থেকে শুরু করে শামুক-ঝিনুক ও বার্মিজ পণ্যের দোকানিরা নতুন করে সাজিয়েছেন তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত শত শত হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট, পাশাপাশি নিরাপত্তায় থাকছে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও লাইফগার্ড।
ঈদের টানা ছুটি। সবার প্রত্যাশা এবারও টানা ছুটিতে কক্সবাজারে সমাগম হবে লাখো পর্যটকের। তাই সবখানে যেন ব্যস্ততার শেষ নেই।
পর্যটকদের আকর্ষণ করতে সৈকতে প্রস্তুত জেট স্কি, বিচ বাইক, ঘোড়া, কিটকট ও ফটোগ্রাফাররা। বিশেষ করে-সৈকতপাড়ে শামুক-ঝিনুক ও বার্মিজ পণ্যের দোকানিরাও নতুন করে সাজিয়েছেন তাদের দোকান। পর্যটকের ভিড়ে জমে উঠবে ব্যবসা-এমনটাই আশা তাদের।
ফটোগ্রাফার আব্দুস সবুর বলেন, গত এক মাস রমজানে পর্যটক কম থাকায় কাজ তেমন হয়নি। তবে ঈদকে সামনে রেখে এখন পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি, ফলে কাজের সুযোগও বাড়বে।
কিটকট ব্যবসায়ী জমির উদ্দিন বলেন, রমজান মাসে পর্যটক কম থাকায় ব্যবসা তেমন জমেনি। তবে ঈদকে কেন্দ্র করে পর্যটক বাড়লে ব্যবসা ভালো হবে বলে আশা করছেন তিনি।
আচারের দোকানদার মাহমুদুল হক সবুজ বলেন, ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের বার্মিজ আচার, চকলেটসহ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে নানা পণ্য সংগ্রহ করে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, কক্সবাজারে আসা পর্যটকরা সাধারণত আচার, চকলেট ও শুঁটকি কিনতে বেশি আগ্রহী।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তাই ঈদে পর্যটকের আগমন বাড়বে এবং ব্যবসাও ভালো হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
লাবণী শুটকি বিতানের স্বত্বাধিকারী শামশেদ আলম বলেন, ঈদ উপলক্ষে সাত দিনের ছুটিকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি দিয়ে দোকান সাজানো হয়েছে। তিনি আশাবাদী, এ সময়ে পর্যটকদের আগমন বাড়বে এবং তাদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
এদিকে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কক্সবাজারের ৫ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট। এরই মধ্যে হোটেলগুলোর কক্ষ বুকিং হয়েছে ৭০ শতাংশ। পর্যটকদের ঈদ আনন্দ দিতে থাকছে নানা আয়োজনও।
হোটেল কক্স-টুডের ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার দুলা বলেন, ঈদকে সামনে রেখে হোটেলের বুকিং বেশ ভালো চলছে। ১৯ তারিখ থেকে পর্যটকদের আগমন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ঈদের মূল ভিড় হিসেবে ২৩ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
রামাদা হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন বলেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের পূর্ণাঙ্গ আনন্দ দিতে বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন (২২ তারিখ) একটি ডিজে প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে দেশের জনপ্রিয় একজন ডিজে শিল্পী পারফর্ম করবেন। পাশাপাশি থাকছে জনপ্রিয় স্যাক্সোফোন বাদকদের পরিবেশনা।
তিনি আরও জানান, বিনোদনের পাশাপাশি খাবারের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে গালা বুফে ডিনার, যেখানে দেশি-বিদেশি নানা স্বাদের খাবার পরিবেশন করা হবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে অতিথিরা স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করতে পারবেন।
কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা প্রায় এক সপ্তাহের ছুটিকে ঘিরে ইতোমধ্যে বিভিন্ন হোটেলে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঈদের পরবর্তী ছুটিতে প্রতিদিন অন্তত লক্ষাধিক পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করবেন। এতে পর্যটন খাতে ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভালো রাজস্ব অর্জন সম্ভব হবে।
লেইজার হোটেলিয়ার্স অব বাংলাদেশ কক্সবাজার জোনের সভাপতি আবু তালেব শাহ বলেন, রমজানের পর ঈদের দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে পর্যটকদের আগমনের অপেক্ষায় আছেন তারা। তিনি জানান, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে মানুষের মধ্যে থাকা সংশয় দূর হয়েছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এখন ভালো। তাই সাত দিনের এই দীর্ঘ ছুটিতে কক্সবাজার পর্যটকে মুখরিত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আর পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত রয়েছে লাইফগার্ড কর্মী ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সৈকতে থাকবে ৩ স্তরের নিরাপত্তা বলয়।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী জহিরুল ইসলাম বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল নামবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফগার্ড সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। সমুদ্র এখন উত্তাল থাকায় পর্যটকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধুমাত্র লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে লাইফগার্ডের উপস্থিতিতে গোসল করা উচিত।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে প্রায় ২৭ জন লাইফগার্ড ও ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কোনো পর্যটক যেন পানিতে ডুবে দুর্ঘটনার শিকার না হন এবং ‘জিরো ড্রাউনিং’ নিশ্চিত করা।
ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক পারভেজ আহমেদ বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি টিম এবং গোয়েন্দা টিম মাঠে কাজ করছে। প্রতিটি টিম পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে।
তিনি আরও জানান, ঈদ উপলক্ষে লক্ষাধিক পর্যটকের আগমনের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যাতে কোনো পর্যটক অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন না হন। এ লক্ষ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশ সর্বদা সজাগ ও প্রস্তুত রয়েছে।
ঈদের টানা ছুটিতে লাখো পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত-এমন প্রত্যাশায় এখন দিন গুনছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।