কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে তীরে হঠাৎ করে জোয়ারের পানিতে ভেসে এসেছে একটি বিশাল আকৃতির মৃত ডলফিন, দুটি কচ্ছপ ও বিভিন্ন প্রজাপতির সামুদ্রিক মাছ।
শনিবার (১৪ মার্চ) সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে সৈকতের লাবনী পয়েন্ট থেকে ডিভাইন ইকো রিসোর্ট পয়েন্ট পর্যন্ত উপকূলে এসব মৃত প্রাণী ভেসে আসে বলে জানিয়েছেন সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সিনিয়র কর্মী জয়নাল আবেদীন ভূট্টো।
তিনি জানান, লাবনী পয়েন্টে পর্যটকদের সমুদ্রস্নানে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি ও সিনিয়র লাইফগার্ড কর্মী মোহাম্মদ ওসমান। দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তারা লাবনী পয়েন্ট থেকে সুগন্ধা পয়েন্ট পর্যন্ত হেঁটে টহল দিচ্ছিলেন। এসময় সমুদ্রের পানিতে দূর দূরান্তে কিছু মাছ ভাসতে দেখা যায়। কাছে গিয়ে দেখা যায়, মাছগুলো মৃত এবং পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
জয়নাল আবেদীন জানান, ভেসে আসা মাছগুলোর মধ্যে রিটা, রুপচাঁদা ও সুষমা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। প্রতিটি মাছের ওজন আনুমানিক ২৫০ গ্রাম থেকে এক কেজির মধ্যে। এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন লাইফগার্ড কর্মী মোহাম্মদ ওসমান।
তিনি আরও বলেন, সকাল প্রায় ১০টার দিকে সৈকতের সি-গাল পয়েন্ট এলাকায় জোয়ারের পানিতে একটি বিশাল আকৃতির মৃত ডলফিন ভেসে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, ডলফিনটি দুই থেকে তিন দিন আগে মারা গেছে। প্রায় ৭ ফুট লম্বা ডলফিনটি দেখতে অস্ট্রেলিয়ান উপকূলে দেখা যাওয়া ‘স্নাবফিন ডলফিন’-এর মতো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরপর সকাল ১১টার দিকে সুগন্ধা পয়েন্টের কিছু দূরে সৈকতে বড় আকারের দুটি মৃত কচ্ছপও ভেসে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, কয়েকদিন আগে সাগরে মারা যাওয়ার পর জোয়ারের পানিতে এগুলো তীরে এসে পৌঁছেছে।
জয়নাল আবেদীন বলেন, হঠাৎ করে কী কারণে এসব সামুদ্রিক প্রাণী মারা গেছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তার ধারণা, ট্রলিং জালে আটকা পড়ে অথবা অন্য কোনো কারণে এসব প্রাণীর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে সৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সুপারভাইজার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জানান, সৈকতের বালিয়াড়িতে ভেসে আসা মৃত ডলফিন ও কচ্ছপ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল এবং এতে পর্যটকেরা বিব্রত হচ্ছিলেন। পরে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের নিয়ে সি-গাল পয়েন্ট এলাকায় ডলফিনটিকে বালিয়াড়িতে গর্ত করে মাটিচাপা দেওয়া হয়। একইভাবে ডিভাইন ইকো রিসোর্ট পয়েন্টের বালিয়াড়িতে দুটি কচ্ছপও গর্ত করে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
সাবেক সচিব ও সমুদ্র গবেষক সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেন, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের জলসীমায় প্রধানত ইরাবতী ডলফিন, ইন্দো-প্যাসিফিক কুঁজো ডলফিন, বোতলনাক ডলফিন, প্যান্ট্রোপিকাল স্পটেড ডলফিন ও স্পিনার ডলফিন বিচরণ করে। সাধারণত এরা সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড ও আশেপাশের এলাকায় থাকে, কখনো দলবদ্ধভাবে কক্সবাজার উপকূলে আসতেও দেখা যায়। পর্যটক কম থাকা অবস্থায় তারা উপকূলের কাছাকাছি বিচরণ করে।
কিন্তু কক্সবাজার উপকূল ডলফিন ও কাছিমের জন্য বিপজ্জনক, কারণ এর নিকটে রয়েছে বৃহৎ ফিশিং গ্রাউন্ড-‘সাউথ প্যাচ’, ‘সাউথ অব সাউথ প্যাচ’ এবং ‘মিডল গ্রাউন্ড’। এখানে হাজার হাজার ট্রলার ও যান্ত্রিক নৌযান দিনরাত মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকে। মাছ ধরার জালে বা “গোস্ট নেটে” ডলফিন ও কাছিম আটকা পড়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। এছাড়া জাহাজের প্রোপেলার আঘাতেও এরা মারা যেতে পারে এবং স্রোতের সঙ্গে সৈকতে ভেসে আসে।
বানিজ্যিক মাছ ধরার সময়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মাছগুলো সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়, যা স্রোতের সঙ্গে ভেসে সৈকতে আসে। সম্প্রতি সৈকতে পাওয়া মৃত ডলফিন ও কাছিম দূষণের কারণে নয়, কারণ দূষণ হলে একসাথে নানা প্রজাতি মারা যেত। ভেসে আসা ডলফিনের মধ্যে ইরাবতী ও স্পিনার ডলফিন, আর কাছিমের মধ্যে অলিভ রিডলি প্রজাতি রয়েছে।