ঈদুল আজহার টানা ছুটি শেষ হলেও কমেনি পর্যটকদের ঢল। দেশের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে এখনও ভিড় করছেন হাজারো ভ্রমণপিপাসু মানুষ। গত দশ দিনে প্রায় ৭ লাখ পর্যটকের আগমনে শুধু সৈকতই মুখর হয়নি, চাঙা হয়েছে পুরো পর্যটন অর্থনীতি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রত্যাশার চেয়েও ভালো গেছে ঈদ মৌসুম। আর চেম্বার অব কমার্স বলছে, এই সময়ে পর্যটন খাতে লেনদেন হয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।
ঈদের ছুটি ঘিরে গত দশ দিনে কক্সবাজারে এসেছে সাত লাখের বেশি পর্যটক। হোটেল-মোটেল-রিসোর্টে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শুধু আবাসন খাত নয়, সৈকতকেন্দ্রিক নানা ব্যবসাতেও এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
পর্যটকদের ভিড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সময় পার করেছেন জেট স্কি চালক, বিচ বাইক ব্যবসায়ী, ঘোড়াওয়ালা, ফটোগ্রাফার এবং কিটকট ব্যবসায়ী। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলেছে তাদের ব্যবসা।
জেট স্কি চালক মোবারক বলেন, “কোরবানির ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের ভালো উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পর্যটক সংখ্যা বাড়ার কারণে আমাদের ব্যবসাও বেশ ভালো চলছে। ইনশাআল্লাহ, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আয়-রোজগার আরও বাড়বে।”
সৈকতের ফটোগ্রাফার কলিম উল্লাহ বলেন, “ঈদের পর থেকে পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়ায় আমাদের আয়ও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ, এবারের ঈদ মৌসুমে ব্যবসা বেশ ভালো যাচ্ছে।”
বিচ বাইক চালক মোহাম্মদ রাসেল বলেন, “ঈদের প্রথম দিকে ব্যবসা কিছুটা ধীরগতির ছিল। তবে ঈদের দুই-এক দিন পর থেকেই পর্যটকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আমরা যে পরিমাণ পর্যটক ও ব্যবসার আশা করেছিলাম, বর্তমানে প্রায় সেই পর্যায়েই রয়েছি। আমাদের তিনটি পয়েন্টে বিচ বাইক পরিচালিত হচ্ছে এবং সবগুলো পয়েন্টেই এখন ভালো ব্যবসা হচ্ছে।”
ঘোড়াওয়ালা শফি আলম বলেন, “ঈদের ছুটিতে এখন অনেক পর্যটক আসছেন, এতে আমাদের ব্যবসা বেশ ভালো হচ্ছে। আমরা আশা করি, সামনে আরও বেশি পর্যটক আসবেন এবং ব্যবসা আরও প্রসারিত হবে। এতে করে এখানকার সৌন্দর্য ও পর্যটন শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে।”
সৈকতপাড়ের শামুক-ঝিনুক, পার্ল ও বার্মিজ পণ্যের দোকানগুলোতেও ছিল ক্রেতাদের ভিড়। পর্যটকদের চাহিদায় বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ।
সুগন্ধা পয়েন্টের পার্ল ও ঝিনুকের সামগ্রীর দোকানদার জসিম উদ্দিন বলেন, “ঈদকে সামনে রেখে আমরা নতুন করে বিভিন্ন ধরনের পার্ল ও ঝিনুকের পণ্যের সংগ্রহ বাড়িয়েছিলাম। প্রত্যাশা অনুযায়ী পর্যটকদের উপস্থিতি বেশ ভালো। আলহামদুলিল্লাহ, পর্যটক সমাগম বাড়ছে এবং সামনে আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। এতে আমাদের ব্যবসাও মোটামুটি ভালো হয়েছে।”
আরেক দোকানি কামাল উদ্দিন বলেন, “ঈদের দুই দিন পর থেকেই পর্যটকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বেচাকেনাও ভালো চলছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকার বেচা-বিক্রি হয়েছে।”
আচার ব্যবসায়ী লিয়াকত আলী বলেন, “ঈদকে সামনে রেখে আমি দোকানে তিন থেকে চার লাখ টাকার বেশি পণ্য মজুত করেছি। ঈদের পর থেকে পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়েছে এবং আলহামদুলিল্লাহ, বেচাকেনাও ভালো হচ্ছে। আমরা যে পরিমাণ ব্যবসার আশা করেছিলাম, বর্তমানে প্রায় সেই পর্যায়েই রয়েছে।”
হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকরাও বলছেন, ঈদকেন্দ্রিক এ মৌসুমে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ব্যবসা হয়েছে।
কলাতলীস্থ শালিক রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সেজান বলেন, “ঈদের আনন্দকে ভিন্নমাত্রায় উপভোগ করতে অনেকেই কক্সবাজারে আসেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ উদযাপনের আগ্রহ থেকেই এবারও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটকের আগমন হয়েছে।
হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, “প্রতিটি উৎসব মৌসুমে, বিশেষ করে ঈদকে ঘিরে আমরা পর্যাপ্ত পর্যটক আগমনের প্রত্যাশায় থাকি। সাধারণত ঈদের পরবর্তী সাত থেকে দশ দিন হোটেল ব্যবসায় ভালো সাড়া পাওয়া যায়। তবে এবার শুরুতে বুকিংয়ের হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় কিছুটা হতাশ ছিলাম। কিন্তু ঈদের ঠিক আগে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে বুকিং উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে বর্তমানে আমাদের হোটেলের কক্ষ বুকিং প্রায় ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা প্রত্যাশার কাছাকাছি।”
চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির হিসাবে, গত দশ দিনে ৭ লাখের বেশি পর্যটকের আগমনে কক্সবাজারের পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, “রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকায় এবং দীর্ঘ ছুটির সুযোগে এবার পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। আমাদের ধারণা, ঈদ উপলক্ষে গত দশ দিনে প্রায় ৭ লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণ করেছেন। এতে পর্যটন খাতে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি অর্থনৈতিক লেনদেন হয়েছে বলে আমরা আশা করছি।”
পর্যটকদের পদচারণায় শুধু মুখর নয় সমুদ্রসৈকত, চাঙা হয়ে উঠেছে কক্সবাজারের পুরো পর্যটন অর্থনীতি। ঈদের এই মৌসুমে পর্যটন খাতে কয়েকশ কোটি টাকার বাণিজ্য নতুন আশার বার্তা দিচ্ছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।