স্মৃতিটা ২১ বছর আগের। ২০০৫ সালে প্রথমবার প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশি, চারপাশের সমুদ্র আর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সালমা ইসলাম। সে সময় টেকনাফ থেকে কাঠের বোটে চড়ে গিয়েছিলেন সেন্টমার্টিন। এরপর কেটে গেছে একুশটি বছর। নানা কারণে আর যাওয়া হয়নি। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো। আবারও প্রিয় সেই দ্বীপে যাচ্ছেন তিনি। পুরোনো স্মৃতিকে সঙ্গী করে সালমা ইসলামের এবারের যাত্রা তাঁর কাছে বিশেষ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে সাতটায় ৮ শতাধিক পর্যটক নিয়ে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় পর্যটকবাহী জাহাজ এমভি বার আউলিয়া। নানা জটিলতা কাটিয়ে মৌসুমের প্রথম জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ছিল বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। এদিন কারও চোখেমুখে বহুদিন পর প্রিয় জায়গায় ফেরার আনন্দ, আবার কারও মনে তৈরি হয় প্রথমবার প্রবালদ্বীপ দেখার রোমাঞ্চ।
এমভি বার আউলিয়া জাহাজের দ্বিতীয় তলায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে একুশ বছর আগের স্মৃতিচারণ করে সালমা ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রথমবার ২০০৫ সালে টেকনাফ দিয়ে সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম। এরপর আর যাওয়া হয়নি। ২১ বছর পর আজ আবার যাচ্ছি। সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য অন্য রকম। এই সৌন্দর্য কখনো ম্লান হয় না। এত বছর পর আবার যেতে পারছি, খুব ভালো লাগছে।’
সালমার মতো দীর্ঘদিন পর দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সোহাইল ইসলামও। তাঁর কাছে এবারের সেন্টমার্টিন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর ও গোছানো মনে হচ্ছে। সোহাইল বলেন, ‘অনুভূতিটা আসলে বলে বোঝানোর মতো নয়। অনেক দিন আগে সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম। তখন পরিবেশ এত সুন্দর ছিল না। এবার পরিবেশটা খুব সুন্দর মনে হচ্ছে। আমরা সরকারি নির্দেশনা মেনে সর্বোচ্চ আনন্দ করব।’
মৌসুমের প্রথম দিনের এই যাত্রায় শুধু ব্যক্তিগত ভ্রমণ নয়, সহকর্মীদের সঙ্গে দল বেঁধেও স্বপ্নের সেন্টমার্টিন যাচ্ছেন অনেকে। জাহাজে রয়েছে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির ২০০ সদস্যের একটি দলও।
দলটির সদস্য বেগম বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক রাজিয়া আক্তার বলেন, ‘আমরা আসলে খুবই উচ্ছ্বসিত। অনেক দিন পর সেন্টমার্টিন যাচ্ছি। আশা করছি, সবকিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও গোছানো পাব। চারপাশে সমুদ্রঘেরা সেন্টমার্টিন আমাদের খুব পছন্দের জায়গা। টিকিট পেতে কোনো ঝামেলা হয়নি। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও একটু সুশৃঙ্খল হলে ভালো হতো।’
এই জাহাজে আরেকটি দলের সঙ্গে যাচ্ছেন শ্রাবণী ধর। তিনি গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সংশয়ে ছিলেন শেষ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন যেতে পারবেন কিনা ভেবে। অবশ্য, রাতে সেই অনিশ্চয়তা কাটার পর আনন্দ আর ধরে রাখতে পারছেন না তিনি।
শ্রাবণী ধর বলেন, ‘এবারের অনুভূতিটাই আলাদা। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম, যেতে পারব কি না। এখন যেতে পারছি, খুবই আনন্দ লাগছে। সবাইকে বলব, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ যেন আমরা রক্ষা করি। দ্বীপে গিয়ে সবাই নিয়মকানুন মেনে চলি।’
সেন্টমার্টিনের প্রতি বারবার ফিরে যাওয়ার এক অদ্ভুত টান অনুভব করেন পর্যটক রাসেল পারভেজ। অনেকবার দ্বীপে গেলেও সেই আকর্ষণ কমেনি তাঁর। তিনি বলেন, ‘বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেন্টমার্টিন যাত্রার আমরা প্রথম যাত্রী। অনেকবার গিয়েছি, কিন্তু দ্বীপটি বারবার আমাকে টানে।’
চট্টগ্রাম থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ‘আগে একবার সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম। এবার মৌসুমের শুরুতেই যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। আশা করছি, দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার বিষয়েও সবাই সচেতন থাকবেন। কেউ যেন প্লাস্টিক বা বর্জ্য ফেলে দ্বীপের ক্ষতি না করি।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা পর্যটক সোহানুর রহমানের কাছেও সেন্টমার্টিন ভ্রমণ দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ দেখতে যাচ্ছেন তিনি। সোহানুর বলেন, ‘বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে আনন্দিত। আশা করি, নিরাপদে ভ্রমণ শেষে সুন্দর স্মৃতি নিয়ে ফিরতে পারব।’