সাইফুল আফ্রিদি
পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে প্রতিদিন অবস্থান করেন ৫০ হাজারের বেশি পর্যটক। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই রয়েছে বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি। শীত মৌসুমে একসঙ্গে হাজার হাজার কক্ষে গিজার, রুম হিটার ও উচ্চ ক্ষমতার বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানোয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এর সঙ্গে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ত্রুটিপূর্ণ ওয়্যারিং, রান্নাঘরের চিমনিতে জমে থাকা দাহ্য গ্রিজ এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও মানসম্মত ওয়্যারিং নিশ্চিত না করায় হোটেলগুলোর এই ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো একেকটি সুপ্ত ‘টাইম বোমা’ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন কক্সবাজার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের প্রধান ও চিফ ইনস্ট্রাক্টর প্রকৌশলী সিরাজুল হক।
শীত মৌসুমে বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ব্যাখ্যা করে প্রকৌশলী সিরাজুল হক বলেন, শীতকালে একসঙ্গে হাজার হাজার কক্ষে গিজার, রুম হিটার ও উচ্চ ক্ষমতার বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো হয়। এতে মূল বৈদ্যুতিক লাইনে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তারের সক্ষমতার বাইরে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে তা অতিরিক্ত গরম হয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে, যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। মানসম্মত ওয়্যারিং, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা নিশ্চিত না করায় হোটেলগুলোর এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তাঁর ভাষায়, এসব অব্যবস্থাপনা এক সুপ্ত ‘টাইম বোমার’ মতো বিপজ্জনক।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড পর্যটন খাতের এই ঝুঁকির ভয়াবহতা সামনে এনেছে। গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে ১১ পর্যটকের প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২৩ অক্টোবর সুগন্ধা পয়েন্টের সি প্রিন্সেস হোটেল এবং গত শুক্রবার রাতে কলাতলীর হোটেল অস্টার ইকোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সি প্রিন্সেসের জেনারেটর কক্ষে আগুন লাগার পর প্রায় ৩০০ পর্যটক তাৎক্ষণিক বেরিয়ে আসে। অস্টার ইকোতেও বৈদ্যুতিক সংযোগের ত্রুটি থেকে আগুন লাগার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানি না ঘটলেও পর্যটকদের বহুতল হোটেল থেকে আতঙ্কিত হয়ে বাইরে অবস্থান করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা।
বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনায় অবহেলা, বাড়ছে ঝুঁকি
হোটেলগুলোর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনায় অবহেলা ও ত্রুটিকে অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার, নির্ধারিত সক্ষমতার বাইরে বিদ্যুৎ লোড এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব থেকে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন কক্সবাজার পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণি।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সস্তা ও নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক সংযোগ দেওয়া হচ্ছে নির্ধারিত সক্ষমতার বাইরে। অভ্যন্তরীণ ওয়্যারিংও মানসম্মত হচ্ছে না। সারা বছর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি না থাকায় ঝুঁকি বাড়ছে।
আবদুল কাদের গণি বলেন, 'প্রটেকশন, কোয়ালিটি ও ক্যাপাসিটি মেইনটেইন করলেই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। বছরের রমজান মাসে যখন পর্যটকের চাপ কম থাকে, তখন হোটেল-মোটেল মালিকেরা চাইলে পুরো ওয়্যারিং তদারকি করতে পারেন। সেফটি প্রটেকশনের জন্য যথাযথ মেইন সার্কিট বসালে কোথাও শর্ট সার্কিট হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে ঝুঁকি কমবে। এ ছাড়া হোটেলগুলোতে কারিগরি দক্ষ কর্মী বা টেকনিক্যাল বিষয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাজে লাগালেও ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।'
শীতের বাড়তি চাপ, রান্নাঘরেও আগুনের ঝুঁকি
শীতকালে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি হোটেলগুলোর বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারও বেড়ে যায়। গিজার, রুম হিটারসহ উচ্চ ক্ষমতার বৈদ্যুতিক যন্ত্র একসঙ্গে চালানোর কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। অন্যদিকে, রান্নাঘরে খাবার তৈরির চাপ বাড়লেও অনেক হোটেলে চিমনি ও এক্সহস্ট ব্যবস্থার নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা হয় না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিভিন্ন হোটেলের রান্নাঘরের এক্সহস্ট চিমনিতে দীর্ঘদিন ধরে তেলের স্তর জমে থাকে। এই গ্রিজ অত্যন্ত দাহ্য। রান্নার চুলার অতিরিক্ত তাপ কিংবা স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এলে তা জ্বলে উঠে চিমনির ভেতর দিয়ে আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে রান্নাঘরের এই অবহেলাও বড় অগ্নিকাণ্ডের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এনওসি নেই ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের
কারিগরি ঝুঁকির পাশাপাশি হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতিও উদ্বেগজনক। পর্যটকদের কাছ থেকে চড়া ভাড়া নেওয়া হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার, সার্কিট ব্রেকার ও সকেট ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। দক্ষ কারিগর দিয়ে বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে নেই।
ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহরের প্রায় ৫০০টি হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টের মধ্যে অন্তত ৪০০টির বৈধ ফায়ার লাইসেন্স বা অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেই। অর্থাৎ, প্রায় ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত অনুমোদন নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ফায়ার সেফটি প্ল্যানও নেই। নিয়ম অনুযায়ী অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র ও নবায়নের ক্ষেত্রে ভবনের অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা ও অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করার কথা। তবে এসব তদারকি কতটা নিয়মিত ও কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পরিদর্শনের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজারের পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, বর্তমানে ছয়টি দল পরিদর্শনের কাজ করছে। কক্সবাজার শহরে চট্টগ্রাম থেকে আসা অতিরিক্ত দুটি দলও কাজ করছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) তৌফিক ভুঁইয়া।
তবে অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার ও আগুন নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়েও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য বলেন, জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি, বহুতল ভবনে পৌঁছানোর মতো হাইড্রলিক ল্যাডার না থাকা এবং শহরের বিভিন্ন এলাকার অপ্রশস্ত সড়ক ও গলিপথের কারণে উদ্ধারকাজে সমস্যা হতে পারে।
ফায়ার এনওসি না থাকা ও অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং মেরিন ড্রাইভ হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, “সরকারের ফায়ার সার্ভিসসহ একাধিক সংস্থা রয়েছে। তারা যদি সেফটি-সিকিউরিটি ঠিক আছে কি না, তা নিয়মিত সরেজমিনে তদারকি করত, তবে এই অগ্নিঝুঁকি অনেকটাই কমে আসত। তবে এখানে মালিকপক্ষেরও অবহেলা আছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদেরই দায়িত্ব, শুধু টাকা কামালেই হবে না। আমরাও সমিতি থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, যাতে শহরের প্রতিটি হোটেলে ফায়ার সেফটি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।”
ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি, আগুন দেখে নামেন পর্যটকেরা
অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি পর্যটকদের জন্য কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন কলাতলীর অস্টার ইকোতে অবস্থান করা ঢাকার পর্যটক তানভীর। তিনি বলেন, 'মধ্যরাতে ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি। তবে আমরা আগুন দেখে ও বিস্ফোরণের শব্দ শুনে নিচে নেমে পড়ি। অন্যান্য পর্যটকেরাও দুর্ঘটনার আশঙ্কা করে নেমে আসেন। আমরা কয়েকজন পর্যটক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করতে জানতাম। সঠিক সময়ে সেটি ব্যবহার করায় বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি।'
টুপটুপ রিসোর্টে প্রাণহানি এবং পরবর্তী সময়ে সুগন্ধা ও কলাতলীর হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পর্যটন শহরের হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে পর্যটকের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বহু প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র নেই, কোথাও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় ত্রুটি, কোথাও প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতি। শুধু ছাড়পত্র প্রদান বা বার্ষিক ফি আদায় নয়, নিয়মিত সরেজমিন পরিদর্শন, ত্রুটি চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে হোটেল মালিকদেরও নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পর্যটন নগরীর হোটেলগুলোতে জমে থাকা অগ্নিঝুঁকির এই ‘টাইম বোমা’ যেকোনো সময় কেড়ে নিতে পারে আরও প্রাণ- এমন অভিমত বিশেষজ্ঞদের।