কক্সবাজারের টেকনাফের যে শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র-আইসিইউতে চিকিৎসাধীন, সে তার দাদার সঙ্গে সকালে দোকান থেকে নাস্তা কিনে আনতে গিয়েছিল। শিশুটির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।
কক্সবাজারের সীমান্ত লাগোয়া এই উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে ৯ বছরের হুজাইফা আফনান মিয়ানমার থেকে ছুটে আসা গুলিতে আহত হওয়ার পর প্রথমে মৃত্যুর খবর দিয়েছিল পুলিশ।
রোববার সকালে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে টেকনাফ থেকে বিকালে চট্টগ্রামে নিয়ে আসেন তার চাচা শওকত আলী।
রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, শিশুর অবস্থা সংকটজনক, তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। লম্বাবিল গ্রামের তেচ্ছা বিল এলাকায় হুজাইফাদের বাড়ি, সেখানে সীমান্ত লাগোয়া স্থানে প্রায় দুইশ পরিবার বসবাস করে।
তার চাচা শওকত বলছিলেন, গত তিনদিন ধরে সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি হচ্ছিল।
“আমাদের বাড়ির তিন কিলোমিটার দূরেই মিয়ানমার সীমান্ত। শনিবার রাতভর সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির আওয়াজ শুনি। কিন্তু আজকে সকাল থেকেই গুলির শব্দ বেশি শুনতে পাই।”
তিনি বলেন, “ভোরে অনেক কুয়াশা ছিল। গোলাগুলির এক পর্যায়ে ওইপারের রাখাইন রাজ্যের সীমান্ত এলাকা থেকে আরাকান আর্মির সদস্যরা আরসার সন্ত্রাসীদের গুলি করতে করতে এপারে চলে আসে। বেশি গোলাগুলির কারণে আমরা ভোর থেকে বাচ্চাদের বের হতে দিইনি।
“আমার বড় ভাইয়ের মেয়ে হুজাইফা তার দাদার সাথে দোকান থেকে নাস্তা কেনার জন্য বের হয়। বাড়ি ফেরার সময় ছুটে আসা গুলি তার শরীরে লাগে। নাস্তা নিয়ে তারা আর ঘরে যেতে পারেনি।”
পেশায় মাছ ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে হুজাইফা সবার বড়। স্থানীয় হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সে।
জসিম উদ্দিনেরা পাঁচ ভাই পরিবার নিয়ে কয়েক পুরুষ ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন।
তাদের বাড়ির এলাকা ও সীমান্তের মধ্যে তিন কিলোমিটার দূরত্বে স্থানীয় লোকজন মাছের চাষ করে থাকে। ওই এলাকায় ছোট একটি খাল দুই দেশকে বিভক্ত করেছে বলে শওকত বলেছেন।
তিনি দাবি করেন, যখন প্রচণ্ড গোলাগুলি হচ্ছিল তখন সীমান্ত এলাকায় বিজিবি সদস্যদের দেখতে পাননি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান হারুনুর রশীদ বলেন, হুজাইফার অবস্থা সংকটাপন্ন। তার মুখের ডান পাশ দিয়ে গুলি লেগেছে। তাকে লাইফ সার্পোটে রাখা হয়েছে।
এদিন সকাল ১০টার দিকে তেচ্ছা ব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয় হুজাইফ। গুলিবিদ্ধ হওয়া শিশুটি মারা গেছে বলে প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানালেও পরে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শাহজালাল দুপুরে জানান, তথ্যটি সঠিক নয়।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস দুপুর ২টার দিকে বলেন, “শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। প্রথমে মারা যাওয়ার কথা শোনা গেলেও তা সঠিক নয়। তাকে চট্টগ্রামে মেডিকেলে নেওয়া হচ্ছে।”
এদিকে হুজাইফা আফনান গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খোকন কান্তি রুদ্র বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।
টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি- আরসার মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। গত তিন দিন ধরে সীমান্তের ওপারে ব্যাপক গোলাগুলিতে এপারেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।