মিয়ানমার থেকে উড়ে আসা বুলেটে ছোট্ট হুজাইফা যখন আহত হয়, তখন থেকে সন্তানের সুস্থতায় প্রার্থনা করে রোজ কাঁদতেন বাবা জসিম উদ্দিন। টানা ২৭ দিন তিনি কেঁদেছেন। ফুরিয়ে গেছে দু’চোখের অশ্রু। তবুও আদরের মেয়েটি চোখ খোলেনি, ‘বাবা’ বলে ডাকেনি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে পাড়ি জমালো অনন্তযাত্রায়।
নয় বছর বয়সী হুজাইফা আফনানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় হতভাগা জসিম। তাঁর চোখে-মুখে হতাশা আর কেবল আক্ষেপ। বুকে পাথরসম কষ্ট। রবিবার সকালে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমার বুক খালি হইছে ভাই, আমি জানি কি রকম কষ্ট! ২৭ দিন কাঁদছি, চোখে আর পানি নাই…।’
জসিমের মতো কন্যা শোকে মুহ্যমান মা সুমাইয়া আক্তারও। ঘরে থাকা হুজাইফার জামা, খেলনা, বই, ব্যাগগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেন আর বুকে জড়িয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন, ‘অ মারে মা, হডে চলি গেলি রে… মা।’
মায়ের সাথে ছোট্ট হুজাইফার অজস্র স্মৃতি। সবটুকু বাস্তবে, কিছু স্মৃতি ধারণ করেছিল ক্যামেরায়। মোবাইল ফোনে থাকা এসব ছবি-ভিডিও স্ক্রলিং করে বার বার দেখছিলেন তিনি।
মায়ের ভাষ্য, ‘আমার মেয়ে বেশি মায়াবী ছিল। সবার বাড়ি বাড়ি যেতো। সবাইকে জড়িয়ে ধরতো। স্কুলে ১ নম্বর হতো। পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিল।’
হুজাইফা জসিম উদ্দিন ও সুমাইয়া আক্তার দম্পতির বড় সন্তান। মো. আদিল (৫), আবদুল্লাহ আল মামুন (৩) নামে তাদের দুই ছেলে রয়েছে। হুজাইফা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
গত শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঢাকা থেকে হুজাইফার মরদেহবাহী গাড়ি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। এরপর রবিবার সকাল থেকেই হুজাইফার মরদেহ একনজর দেখার জন্য বাড়িতে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ সময় উপস্থিত স্বজন ও প্রতিবেশীরা অশ্রুসজল হয়ে পড়েন।
নাতিকে হারিয়ে দাদা আবুল হাশেম (৬০) কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘আমি খুবই মর্মাহত। আমার নাতি খুব অমায়িক ছিল। সবার কাছে তার জন্য দোয়া চাই।’
দাদী ফরিদা বেগম বলেন, ‘বামার মগে গুলি মারি আঁর নাতিরে মারি ফেইল্ল্যে। আর নাতি বেশি কষ্ট পাইয়্যে।’
হুজাইফা লাইফ সাপোর্টে থাকাকালে সর্বক্ষণিক পাশে ছিলেন চাচা মো. এরশাদ। তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন ভাইঝির সেই দুঃসহ সময়গুলো। এরশাদ বলেন, ‘হুজাইফা লাইফ সাপোর্টে থাকাকালে কথা বলতে পারতো না। ডাকলে শুনতো। চোখ, হাত-পা নাড়াচাড়া করতো। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু হায়াতের মালিক আল্লাহ।’
যেভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল হুজাইফা
এগারোই জানুয়ারি, সকাল ১০টা। পৌষের নরম সকাল। হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল সীমান্ত এলাকা। দাদা আবুল হাশেমের হাত ধরে হুজাইফা দূরের দোকানে গিয়েছিলেন নাস্তা আনতে। নাস্তা কিনে দিয়ে নাতিকে বাড়ির পথ ধরিয়ে দেন দাদা হাশেম। পথিমধ্যে বাড়ি থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে প্যাকেট খুলে নাস্তা খাচ্ছিলেন হুজাইফা। তাৎক্ষণিক মিয়ানমারে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষের সময় দেশটি থেকে ছোড়া একটি গুলিতে গুরুতর আহত হয় হুজাইফা।
তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। দীর্ঘ ২৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হুজাইফার মৃত্যু হয়।
‘আমরা নিরাপদে বসবাস করতে চাই’
টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত। হুজাইফাদের বাড়ি থেকে নাফ নদীর দূরত্ব ৩-৪ কিলোমিটার। ওপারে মিয়ানমার। এখানকার গ্রামে থেমে আছে চাষাবাদ, মাছ ধরা। খালি পড়ে আছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। গ্রামবাসীরা আছেন আতঙ্কে।
ওপারের সবুজ পাহাড় থেকে সকাল, দুপুর কিংবা মধ্যরাতে এপারে উড়ে আসে গুলি, রকেট লঞ্চার, গুলির খোসা। প্রতিনিয়ত ঘটছে হতাহতের ঘটনা। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ রয়েছে।
হুজাইফার পিতা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর গুলি যেন উখিয়া-টেকনাফের মানুষের গায়ে না লাগে, তার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’
দাদা আবুল হাশেম বলেন, ‘আমরা অনেক আতঙ্কের মধ্যে আছি। মনে হয়, পরাধীন দেশে বসবাস করছি। কীভাবে স্বাধীন দেশের ভূখণ্ডে বাইরের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এতো বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে-এটাই আমার প্রশ্ন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো বিদ্রোহী গ্রুপ যাতে এখানকার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে না পারে, তার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। আমরা নিরাপদভাবে বসবাস করতে চাই।’
জানাজা ও দাফন সম্পন্ন :
রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় হুজাইফার নামাজে জানাজা। জানাজায় শোকাহত মানুষের ঢল নেমেছিল।
জানাজায় উখিয়া-টেকনাফ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কক্সবাজার জেলা আমির ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী নুর মোহাম্মদ আনোয়ারীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং এলাকার শত শত মানুষ অংশ নেন। এরপর যেখানে খেলাধুলায় মগ্ন থাকতো সেই মাঠের পাশেই কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় শিশুটিকে।