গত ফেব্রুয়ারী মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১৩৪১ টাকা নির্ধারণ করেছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সংস্থাটি প্রতি মাসেই এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। তবে বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে এলপিজির সরবরাহ–সংকট চলছে। প্রতি সিলিন্ডারে এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দাম নিচ্ছেন বিক্রেতারা। বিইআরসি দাম নির্ধারন করলেও তার প্রভাব নেই বাজারে। অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সিলিন্ডার প্রতি ৫০০-৬০০ টাকা বাড়তি নিচ্ছে। ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি ১৮০০-১৮৫০ টাকা। কিছু কিছু জায়গায় তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারী) শহরের বাহারছড়া, নুনিয়াছড়া, গাড়ির মাঠ, এন্ডারসন রোড, বাজার ঘাটা, টেকপাড়া, রুমলিয়ার ছড়া, আলির জাহালসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে এই চিত্র।
জেলা ভোক্তা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরের শেষের দিক থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ৮ টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। যেখানে ১০ টি প্রতিষ্ঠানকে ১ লক্ষ ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত বাজার মনিটরিং করে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডিলারদের সতর্ক করছেন জেলা ভোক্তা কর্মকর্তা হাসান আল মারুফ।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ১৮০০ থেকে ১৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন দোকানে আই গ্যাস, ফ্রেশ, পেট্রোম্যাক্স, জেমআইসহ আরও কয়েকটি কোম্পানির গ্যাস দেখা গেছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, গত তিন মাস থেকে গ্যাসের দাম বাড়তি। তবে এতো দাম বাড়ার নজির এবার প্রথম। প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি। যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কক্সবাজারে এলাকাভেদে গ্যাস ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন।
তবে বিক্রেতাদের দাবি, বাজারে সিলিন্ডারের সরবরাহ কম থাকায় তাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, ফলে বিক্রির দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন কোম্পানির নিয়োগকৃত ডিলাররা তাঁদের খেয়াল-খুশি মতো সিলিন্ডারের দাম নিচ্ছেন। এমনকি প্রতিটি এলপিজি বিক্রি করা দোকানে নির্ধারিত মূল্যতালিকা প্রদর্শনেরও নির্দেশনা থাকলে-ও দাম তা মানা হচ্ছে না।
বাংলাবাজার এলাকার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান কক্স ট্রেড লিংক'এ প্রতিদিন তিন শতাধিক সিলিন্ডারের চাহিদা থাকে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান মিলছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফ্রেশ কোম্পানির ডিলার মোহাম্মদ শাহাদাত বলেন, '১২ কেজির সিলিন্ডার পরিবেশকের কাছ থেকে তাঁকে কিনতে হচ্ছে ১৬০০ থেকে ১৬৫০ টাকা। প্রতি সিলিন্ডারে ২০ টাকা মুনাফা হয়।
‘সরকার নির্ধারিত গ্যাসের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা।’ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো এই দামে গ্যাস দিচ্ছে না। তাহলে খুচরা পর্যায়ে দাম কমবে কিভাবে ?
জেল গেইট এলাকার ওসানিক ট্রেডিং'র কর্ণধার গোলাম আরিফ লিটন বলেন, 'দেশের সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলো এখনো সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। মাত্র হাতগোনা দুই একটি কোম্পানি গ্যাস আমদানি করছে। একারণে চাহিদার তুলনায় সংকট বেশি। যার কারনে দামও বাড়তি।’
তিনি বলেন, কক্সবাজারে দৈনিক চাহিদা ৩০ হাজারের বেশি। কিন্তু, ৪০০ সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে পাওয়া যায় ১০০-২০০ সিলিন্ডার'।
এদিকে খুচরা ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। একদিকে ক্রেতাদের চাপ, অন্যদিকে ডিলারদের বাড়তি দর।
বাহারছড়া কাজল এন্টারপ্রাইজের কাজল ও সাহিল এন্ড সোহা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শফিউল আলম বলেন, 'ক্রেতাদের সাথে প্রতিদিন তর্ক হচ্ছে। ক্রেতারা মনে করছেন, আমরা বাড়তি দাম নিচ্ছি। আমরা ডিলার থেকে বাড়তি দামে গ্যাস ক্রয় করে ৩০-৫০ টাকা ব্যবসা হয়। তারা আমাদের কোন ভাউচার দেয় না। এজন্য ভোক্তাদের সাথে প্রায় বাড়াবাড়ি হয়'।
বিইআরসি তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন। বাজারটি পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫২টি। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্ট রয়েছে। আমদানির সক্ষমতা আছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি।
জেলা এলপিজির সমিতির সভাপতি সরওয়ার আলম দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। একারণে গ্যাসের দাম কমছে না'।
জেলা ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক হাসান আল মারুফ দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, ‘গত দুইমাস শুধু গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ রাখতে ৮ টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। খুরুশকুল রাস্তার মাথা এলাকায় মাম্মি এন্টারপ্রাইজ, জেল গেইট এলাকায় ওসানিক ট্রেডিং, বাংলা বাজার এলাকার কক্স ট্রেড লিংকসহ ১০ টি প্রতিষ্ঠানকে ১ লক্ষ ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। খুচরা ব্যাবসায়ীদের দোকানে মূল্য তালিকা প্রদর্শনের জন্য বলা আছে।’