ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে এবার নতুন করে যুক্ত হচ্ছে মহানগর এক্সপ্রেস। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ট্রেনটি আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত চলাচল করবে। এতে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীসহ মধ্যবর্তী বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা নিজ নিজ স্টেশন থেকে সরাসরি কক্সবাজার যেতে পারবেন। নতুন এই ট্রেনের সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৮৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৭০ টাকা। আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থেকে ২৬ অক্টোবরের যাত্রার টিকিট বিক্রি শুরু হচ্ছে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, মহানগর এক্সপ্রেস প্রতিদিন রাত সাড়ে আটটায় ঢাকা থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাবে রাত ২টা ৪০ মিনিটে। এরপর সকাল ছয়টায় পৌঁছাবে কক্সবাজারে। ফিরতি পথে কক্সবাজার থেকে সকাল নয়টায় ছেড়ে চট্টগ্রাম স্টেশনে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে যাত্রাবিরতি দেবে। এরপর ঢাকায় পৌঁছাবে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায়। রোববার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকবে ট্রেনটির। কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার যাত্রায় ২৭ অক্টোবরের টিকিট বিক্রি শুরু হবে আগামীকাল শনিবার।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম মাস্টার মো. মেহেদী হাসান জানান, কক্সবাজার থেকে ঢাকা পর্যন্ত মহানগর এক্সপ্রেসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৬৮৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সর্বনিম্ন ভাড়া ২৪০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫৪৭ টাকা।
মধ্যবর্তী জেলার যাত্রীদের সুবিধা
বর্তমানে কক্সবাজার রুটে ঢাকা থেকে দুই জোড়া এবং চট্টগ্রাম থেকে দুই জোড়া ট্রেন চলাচল করছে। নতুন করে মহানগর এক্সপ্রেস যুক্ত হলে এই রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়বে। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের মধ্যবর্তী স্টেশনগুলো থেকে কক্সবাজারে সরাসরি যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।
ঢাকার কমলাপুর থেকে ছেড়ে মহানগর এক্সপ্রেস বর্তমানে ১২টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। বর্ধিত রুটে সীতাকুণ্ডের কুমিরা স্টেশনে যাত্রাবিরতি বাতিল করা হয়েছে। তবে বিমানবন্দর, নরসিংদী, ভৈরব বাজার, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কসবা, কুমিল্লা, লাকসাম, নাঙ্গলকোট ও ফেনী স্টেশনে আগের মতোই থামবে ট্রেনটি।
রেলওয়ের দাপ্তরিক আদেশ অনুযায়ী, মহানগর এক্সপ্রেসে থাকবে ১৬টি কোচ। ট্রেনটির আসনসংখ্যা ৭০০ থেকে বাড়িয়ে ৭৩৬ করা হয়েছে।
কুমিল্লার বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, সরাসরি ট্রেন না থাকায় আগে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজার যেতে বাড়তি সময় ও ঝামেলা পোহাতে হতো। নতুন ট্রেন চালু হলে স্টেশন পরিবর্তন না করেই কক্সবাজার যাওয়া যাবে। এতে যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন খাতও উপকৃত হবে বলে তিনি মনে করেন।
আরেক যাত্রী আবির হোসেন বলেন, বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রাবিরতির কারণে আরও বেশি মানুষ কক্সবাজার যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখা জরুরি। নিয়মিত বিলম্ব কমানো গেলে যাত্রীদের আগ্রহ আরও বাড়বে।
টিকিটপ্রাপ্তি ও সময়ানুবর্তিতা নিয়ে প্রত্যাশা
নতুন ট্রেন চালুর খবরে যাত্রীরা খুশি হলেও টিকিটের সহজলভ্যতা, কালোবাজারি বন্ধ এবং সময়মতো ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
যাত্রী সাবিনা হক বলেন, নতুন ট্রেন চালু হওয়ায় তাঁরা আনন্দিত। তবে সহজে টিকিট পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী যাতায়াত করতে পারেন।
পর্যটক কেয়া হক বলেন, অনলাইন ও অফলাইন-কোনো মাধ্যমেই অনেক সময় সহজে ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায় না। টিকিট বিক্রি শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রাপথ কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে। আগামী ২৬ অক্টোবর ঢাকা থেকে ট্রেনটির যাত্রা শুরু হবে এবং ২৭ অক্টোবর থেকে কক্সবাজার স্টেশন থেকে নিয়মিত যাত্রীসেবা চালু হবে। যাত্রীদের সেবা নিশ্চিত করতে স্টেশন কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে।
তবে স্টেশনে কিছুটা জনবলসংকট রয়েছে বলে জানান তিনি। পর্যায়ক্রমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাবের আশা
মহানগর এক্সপ্রেস চালু হলে কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, সরাসরি ট্রেন যোগাযোগের ফলে মধ্যবর্তী জেলার মানুষের জন্য কক্সবাজার ভ্রমণ সহজ হবে। এতে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন খাতে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
হোটেল কক্স-টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব শাহ বলেন, নতুন ট্রেনের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের যাত্রীরা নিজ নিজ এলাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারে আসার সুযোগ পাবেন। এতে দেশীয় পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে হোটেল-রেস্তোরাঁর পাশাপাশি পরিবহন, মাছ ও সবজির বাজার এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলা ও নিয়োগের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
রেলওয়ের এই উদ্যোগে কক্সবাজারের সঙ্গে দেশের মধ্যবর্তী জেলাগুলোর সরাসরি যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে আশা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। তবে নতুন ট্রেনের সুফল পুরোপুরি পেতে টিকিটের সহজলভ্যতা, সেবার মান ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন যাত্রীরা।