কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসন থেকে বিপুল জনরায়ে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র কেন্দ্রীয় নেতা আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ। নিজেকে জনগণের ‘খাদেম’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি এই অবহেলিত জনপদকে একটি সন্ত্রাসমুক্ত, বৈষম্যহীন ও আধুনিক মডেল হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু বাস্তবায়ন এবং উপকূল রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকে তিনি তাঁর মেয়াদের প্রধান অগ্রাধিকার ও লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত এই আসনের আগামীর উন্নয়ন পরিকল্পনা, লবণচাষিদের অধিকার এবং মেগা প্রকল্পগুলোতে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা নিয়ে ‘দৈনিক কক্সবাজার’-এর সাথে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। তাঁর সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: মোহাম্মদ মুজিবুল ইসলাম, পরিচালনা সম্পাদক, দৈনিক কক্সবাজার।
উপস্থিত ছিলেন: মনতোষ বেদজ্ঞ (চিফ রিপোর্টার), তাজুল ইসলাম পলাশ (সিনিয়র রিপোর্টার), সোয়েব সাঈদ (স্টাফ রিপোর্টার, রামু) ও জয়নাল আবেদীন (স্টাফ রিপোর্টার, মহেশখালী), এম.এ মান্নান (স্টাফ রিপোর্টার, কুতুবদিয়া)।
দৈনিক কক্সবাজার: আসসালামু আলাইকুম।
আলমগীর ফরিদ: ওয়ালাইকুমাস্সালাম ওরাহমাতুল্লাহ।
দৈনিক কক্সবাজার: কেমন আছেন?
আলমগীর ফরিদ: আলহামুলিল্লাহ, ভালো আছি।
দৈনিক কক্সবাজার: রাষ্ট্রের অর্থনীতির দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন বলা হয় কক্সবাজার-২ আসনকে। এখানেই বাস্তবায়িত হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ দেশের অন্যতম বৃহৎ একাধিক মেগা প্রকল্প। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অনেক চ্যালেঞ্জিং ভোটের মাঠে বিপুল গণরায়ে আপনি এ আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ অবস্থায় আপনাকে এবং আপনার দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে আমাদের আজকের এই আলাপ শুরু করতে চাই।
দৈনিক কক্সবাজার: গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি থেকে আপনি তৃতীয়বারের মতো এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে জানতে চাই, নতুন এই মেয়াদে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার মানুষ আপনার কাছে নতুন কী ধরনের চমক বা পরিবর্তন আশা করতে পারে? পাশাপাশি নির্বাচন-পরবর্তী এলাকায় শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থান বজায় রাখতে আপনি কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন? ক্ষমতা পরিবর্তনের পর অনেক সময় দলের কিছু নেতাকর্মী অতি-উৎসাহী হয়ে জমি দখল বা বিভিন্ন বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে—এমন পরিস্থিতিতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আপনার বার্তা কী?
আলমগীর ফরিদ: "প্রথমেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া এবং মহেশখালী-কুতুবদিয়ার ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, যারা দীর্ঘ সময় পর ধানের শীষকে বিজয়ী করেছেন। কক্সবাজার-২ আসনটি বর্তমানে দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এখানে গভীর সমুদ্র বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিশাল সব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা আমাদের জন্য গৌরবের।
আগামী দিনে আমাদের বড় লক্ষ্য হলো মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু বাস্তবায়ন। আমাদের নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ এই সেতুর বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া কুতুবদিয়াকে মূল ভূখণ্ডের সাথে ফেরি সার্ভিসের মাধ্যমে যুক্ত করা এবং দ্বীপটিকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। বিগত সরকারের আমলে বেড়িবাঁধ নিয়ে শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। আমরা এবার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টেকসই ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে উপকূলবাসীকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করব।
দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আমার বার্তা অত্যন্ত কঠোর—কোনো ধরনের দখলবাজি বা চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না। আমরা সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। এছাড়া মহেশখালীর উপকূলে পরিবেশ বিধ্বংসী কোনো অবৈধ প্রজেক্ট বা বন উজাড় করতে দেওয়া হবে না। আমরা জনগণকে সাথে নিয়ে সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি আধুনিক ও মডেল নির্বাচনী এলাকা গড়ে তুলব।"
দৈনিক কক্সবাজার: কুতুবদিয়া ও মহেশখালীর মানুষের প্রধান অর্থকরী পেশা লবণ উৎপাদন। কিন্তু বর্তমানে মাঠে প্রতি মণ লবণের দাম মাত্র ১৬০ টাকা, যা দিয়ে উৎপাদন খরচও উঠছে না। আপনি লবণচাষিদের স্বার্থ নিয়ে শুরু থেকেই সোচ্চার ছিলেন, এমনকি লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে ‘কাফনের কাপড়’ পরে সংসদে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। এখন শুধু লবণ আমদানি বন্ধ করাই কি যথেষ্ট? প্রান্তিক চাষিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘদিনের দাবি- একটি স্বতন্ত্র ‘লবণ বোর্ড’ গঠনে সংসদে আপনি কী ভূমিকা রাখবেন?
আলমগীর ফরিদ : "আপনার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত সঠিক। কক্সবাজার ও বাঁশখালীর প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা এই লবণ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, বর্তমানে চাষিরা লবণের উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। মাঠে প্রতি কেজি লবণের দাম ৪ টাকারও কম, অথচ ভোক্তা পর্যায়ে সেই লবণ ৩০-৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে—এই বিশাল বৈষম্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
বিগত সরকারের মদদপুষ্ট বড় বড় মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবণের নামে দেদারসে সোডিয়াম সালফেট আমদানি করেছে, যা আমাদের স্থানীয় বাজারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। চাষিদের বাঁচাতে হলে লবণের দাম অন্তত ৪০০ টাকা মণ (প্রতি কেজি ১০ টাকা) নিশ্চিত করতে হবে। চাষিরা যদি ন্যায্যমূল্য না পেয়ে আগামীতে লবণ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তবে সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করতে হবে।
আমি নির্বাচনী জনসভায় কথা দিয়েছিলাম, প্রয়োজনে কাফনের কাপড় পরে হলেও সংসদে লবণ চাষিদের অধিকার আদায়ের লড়াই করব। মহেশখালী-কুতুবদিয়ার মেগা প্রকল্প ও বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন দেশকে আলোকিত করছে, তখন আমাদের চাষিরা অন্ধকারে থাকবে বা না খেয়ে মরবে তা হতে দেওয়া হবে না। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব যাতে এই সরকারের আমলেই কক্সবাজারে একটি স্বতন্ত্র লবণ বোর্ড গঠন করা হয় এবং আমাদের চাষিরা তাদের হকের ন্যায্যমূল্য ফিরে পায়।"
দৈনিক কক্সবাজার: মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী তিনটি পণ্য—লবণ, মিষ্টি পান এবং শুঁটকি। এই পণ্যগুলোকে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবি এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের। ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে জিআই তালিকাভুক্ত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আপনি কী ধরনের জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন?
আলমগীর ফরিদ: "আপনাকে ধন্যবাদ। মহেশখালীর লবণ, মিষ্টি পান ও শুঁটকি আমাদের গর্ব। এছাড়া এখানকার বাগদা চিংড়ি ও সাদা সোনা হিসেবে পরিচিত মৎস্য সম্পদেরও বিশাল অবদান রয়েছে। ১৯৭৯ সালে শহীদ জিয়ার আমল থেকেই মহেশখালীর মৎস্য ও কৃষি সম্পদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। এমনকি ঘটিভাঙ্গায় মুক্তা চাষের একটি উদ্যোগও তখন নেওয়া হয়েছিল, যা এখন বিলুপ্তির পথে। আমি সেসব ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে কাজ করব।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ১৯৯৬ ও ২০০১ সাল থেকেই লবণের অধিকার নিয়ে সোচ্চার। সংসদে গেলেই তৎকালীন সহকর্মীরা বলতেন যে 'ফরিদ এখন লবণের কথা বলবে'। বিগত সময়ে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন আমরা লবণের ভালো দাম নিশ্চিত করতে পেরেছিলাম। এ বছরও লবণের আমদানির একটি পাঁয়তারা চলছিল, কিন্তু আমাদের জোরালো আপত্তির কারণে তা বন্ধ রাখা সম্ভব হয়েছে। লবণের বর্তমান দরপতনের কারণগুলো আমরা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছি। মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পান, শুঁটকি ও বাগদা চিংড়িকে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংসদে জোরালো প্রচেষ্টা চালাব।"
দৈনিক কক্সবাজার: দুই দ্বীপের মানুষের প্রধান সমস্যা এখনো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিশেষ করে 'মহেশখালী সেতু' নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি। অন্যদিকে কুতুবদিয়া চ্যানেল পারাপারে নিরাপদ সি-ট্রাকের পাশাপাশি ফেরি সার্ভিস চালুর দাবি রয়েছে। এই দুই দ্বীপের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনে আপনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা কী?
আলমগীর ফরিদ: "যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু আমাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন, যা বাস্তবায়নে জননেতা সালাউদ্দিন আহমেদও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কুতুবদিয়া চ্যানেলে বর্তমানে সি-ট্রাক চললেও যাত্রীস্বল্পতা ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তা খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। তাই আমরা সেখানে আধুনিক ফেরি সার্ভিস চালুর বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি।
সড়ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। মহেশখালীর গোরকঘাটা-জনতাবাজার সড়ক এবং কুতুবদিয়ার আজম সড়ককে আগামী দুই বছরের মধ্যে দুই লেনে উন্নীত করার চেষ্টা করব। এছাড়া গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চললে মহেশখালীতে রেললাইন সংযোগ আসবে এবং ভবিষ্যতে আমরা সেখানে উড়াল সেতু (Elevated Expressway) নির্মাণের পরিকল্পনাও রাখছি।
আরেকটি বড় সুখবর হলো—আনোয়ারা-বাঁশখালী হয়ে মহেশখালী পর্যন্ত যে চার লেনের সড়কটি নির্মিত হবে, তার ফলে চট্টগ্রাম থেকে আমাদের এই অঞ্চলের দূরত্ব ও সময় প্রায় তিন ঘণ্টা কমে আসবে। ইনশাআল্লাহ, সালাউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে কক্সবাজারের চারজন সংসদ সদস্য মিলে আমরা আধুনিক ও মডেল কক্সবাজার বিনির্মাণে ইতিহাস সৃষ্টি করব।"
দৈনিক কক্সবাজার: মহেশখালীতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে প্রচুর ভূমি অধিগ্রহণ হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ কক্সবাজার এলএ অফিসে চরম দুর্নীতি ও হয়রানির কারণে প্রকৃত জমির মালিকরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাননি। হয়রানি বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে আপনি কী ব্যবস্থা নেবেন? স্থানীয়দের ভোগান্তি কমাতে মহেশখালী থেকেই এলএ অফিসের সেবা দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা কি আপনার আছে?
আলমগীর ফরিদ: "আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যৌক্তিক। গত সাড়ে ১৭ বছর আমাদের মানুষ কথা বলতে না পারলেও নীরবে অনেক নিপীড়ন সহ্য করেছে। মাতারবাড়ী, ধলঘাটা, কালারমারছড়া ও শাপলাপুরের মানুষ জমি দিয়েও এলএ অফিসের চরম হয়রানির শিকার হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে এমনকি সাবেক জেলা প্রশাসককেও কারাবরণ করতে হয়েছে। জমির ন্যায্য মূল্যের একটি বড় অংশ যদি ঘুষ বা দালালদের পেছনে খরচ হয়ে যায়, তবে প্রকৃত মালিকের হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
আমি মনে করি, ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে আধুনিক ব্যাংকিং বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা জরুরি। মাতারবাড়ী বা কালারমারছড়াতে এখন ব্যাংক শাখা রয়েছে। ভুক্তভোগী মানুষকে কক্সবাজারে গিয়ে দালালের পেছনে না ঘুরে কেন তাদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানো হবে না? প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মহেশখালীতে এসে সরাসরি সেবা দেবেন।
আমার নির্বাচনী ইশতেহারেও আমি এই ভোগান্তি কমানোর অঙ্গীকার করেছিলাম। ইনশাআল্লাহ, আমরা এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব যেখানে কোনো ধরনের তদবির বা কমিশন ছাড়াই জমির প্রকৃত মালিকরা ঘরে বসে তাদের পাওনা বুঝে পাবেন। এলএ অফিসের হয়রানি বন্ধে আমি প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জোরালো ভূমিকা রাখব।"
দৈনিক কক্সবাজার: মহেশখালীর পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকায় যুগ যুগ ধরে বসবাস করা অনেক মানুষের খাসজমির স্থায়ী বন্দোবস্ত বা মালিকানা নেই। এই আইনি জটিলতার কারণে তারা সবসময় উচ্ছেদের আতঙ্কে থাকেন। পাহাড়ে ও উপকূলে বসবাসকারী এই প্রান্তিক মানুষদের খাসজমির মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আপনার কোনো উদ্যোগ থাকবে কি?
আলমগীর ফরিদ: "ইনশাআল্লাহ, অবশ্যই থাকবে। মহেশখালী একটি অনন্য দ্বীপ, যেখানে পাহাড় আর সমুদ্রের এক অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে। আজ গভীর সমুদ্র বন্দর ও বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কারণে মহেশখালী-কুতুবদিয়াবাসী হিসেবে আমরা গর্ববোধ করি। তবে এই অঞ্চলের মানুষের জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা রয়ে গেছে।
মহেশখালীতে প্রায় ১৮ হাজার একর পাহাড়ি জমি আছে, যেখানে আমাদের পূর্বপুরুষরা যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন। ২০০১ সালে আমাদের সরকারের আমলে এসব জমি রেজিস্ট্রির সুযোগ ছিল এবং খাজনাও আদায় করা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে আইনি জটিলতায় তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষের ঘরবাড়ি বা বসতি থাকলেও বন বিভাগ সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ বা এলজিইডির রাস্তা নির্মাণে বাধা দিচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি মনে করি, যার যেখানে অবস্থান এবং পৈত্রিক অধিকার আছে, তাকে সেখানে নিরঙ্কুশভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে হবে।
একই অবস্থা লবণের জমি এবং চিংড়ি ঘেরের ক্ষেত্রেও। আমাদের আমলের অনেক লিজ ২০১১-১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকার নবায়ন করেনি। অথচ মানুষ সেখানে চাষাবাদ করছে, কিন্তু সরকার রেভিনিউ বা খাজনা পাচ্ছে না। আমি সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করব যাতে একটি সুষ্ঠু নীতিমালার আওতায় পাহাড় ও উপকূলের এই জমিগুলোর বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের উচ্ছেদ আতঙ্ক কাটবে, অন্যদিকে সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব পাবে। প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে আমি সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখব।"
দৈনিক কক্সবাজার: অনেকের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে এই আসনের উন্নয়নমূলক কাজের ৯০ ভাগই হয়েছে মহেশখালীতে। কুতুবদিয়ার প্রতি এই বিমাতাসুলভ আচরণ দূর করতে আপনি কী করবেন? বিশেষ করে কুতুবদিয়ার অসমাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজটিকে আপনি কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন? পাশাপাশি মহেশখালীর বেড়িবাঁধেরও খারাপ অবস্থা, বিশেষ করে মাতারবাড়িতে টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি দীর্ঘদিনের। সামগ্রিকভাবে দুই দ্বীপকে সমানতালে অগ্রসর করতে আপনার পরিকল্পনা কী?
আলমগীর ফরিদ: "আমি কুতুবদিয়া এবং মহেশখালীকে একজন মানুষের দুই নয়নের মতো দেখি। কুতুবদিয়ার মানুষ যেভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও ধানের শীষকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে, তাতে তাদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণের কোনো প্রশ্নই আসে না। কুতুবদিয়া ও মহেশখালীর জনসংখ্যা ও আয়তনের অনুপাতে আমরা এলজিইডি ও অন্যান্য দপ্তরের মাধ্যমে সমানতালে উন্নয়ন করার পরিকল্পনা নিয়েছি। বর্তমানে এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ আসছে, যা দিয়ে আমরা দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন করতে পারব।
বেড়িবাঁধের বিষয়ে আমি গত শুক্রবারও ওয়াপদার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। কুতুবদিয়াকে সুরক্ষিত করতে এক হাজার কোটি টাকার একটি প্রটেকটিভ ওয়ার্ক প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। একইভাবে মহেশখালীর মাতারবাড়ী ও ধলঘাটার জন্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ১২ লক্ষ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পগুলো বাঁচাতে হলে আগে টেকসই বেড়িবাঁধ দিয়ে উপকূল রক্ষা করতে হবে। নাহলে সব উন্নয়নই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর প্রসঙ্গে আমি বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো দাবি জানাব—আপনারা বন্দর করছেন, আমরা জায়গা দিচ্ছি; কিন্তু আমাদের রাস্তাঘাট ও বেড়িবাঁধের কাজকে সবার আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি যারা জায়গা-জমি দিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, সেই মাতারবাড়ী ও ধলঘাটার স্থানীয় বাসিন্দাদের বন্দরে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। আমি দুই দ্বীপের সুষম উন্নয়ন ও অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর।"
দৈনিক কক্সবাজার: মহেশখালীতে চলমান বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের হার খুবই হতাশাজনক। তরুণদের বেকারত্ব দূর করতে এসব প্রকল্পে স্থানীয়দের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি এবং তাদের দক্ষ করে তুলতে কারিগরি প্রশিক্ষণের (ভোকেশনাল ট্রেনিং) ব্যবস্থা করার কোনো পরিকল্পনা আপনার আছে কি?
আলমগীর ফরিদ: "এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা কারিগরি দক্ষতা ছাড়া আমাদের তরুণরা বড় প্রকল্পগুলোতে কাজের সুযোগ পাবে না—এটি সত্য। এ কারণেই আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় যুবকদের দক্ষ করে তোলার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি।
বিশেষ করে মাতারবাড়ী, ধলঘাটা ও কালারমারছড়ার যেসব মানুষ তাদের পৈত্রিক ভিটা ও জমি দিয়ে আজ নিঃস্ব হয়ে গেছেন, তাদের সন্তানদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমি সরকারকে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে স্পষ্ট করে বলতে চাই—যাদের জায়গা-জমি নিয়ে এই মেগা প্রকল্পগুলো হচ্ছে, তাদের অবজ্ঞা করে বাইরে থেকে শ্রমিক বা লোক এনে কাজ করানো চলবে না। আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সাফ জানিয়ে দিচ্ছি, স্থানীয়দের উপেক্ষা করা হলে আমাদের অঞ্চলের মানুষের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা ক্ষুণ্ণ হবে, যা আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না।
আমি বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাব, আপনারা ধলঘাটাতে বন্দর করছেন কিন্তু সেখানকার প্রধান সড়কটির অবস্থা বেহাল, বেড়িবাঁধ দিয়ে গত বছরও নোনা পানি ঢুকেছে—এসব সংস্কারে আগে হাত দিন। মাতারবাড়ী ও কুতুবদিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারলে কুতুবদিয়াবাসীও এই উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারবে। আমি আবারও বলছি, আমাদের সাথে আলোচনা ব্যতীত এবং স্থানীয়দের বঞ্চিত করে লোক নিয়োগ করা হলে তা কর্তৃপক্ষের জন্য শুভ হবে না। আমরা চাই মহেশখালী-কুতুবদিয়ার প্রতিটি শিক্ষিত ও দক্ষ যুবক এই মেগা প্রকল্পগুলোতে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাক।"
দৈনিক কক্সবাজার: সোনাদিয়া পর্যটন সম্ভাবনার একটি চমৎকার সুন্দর দ্বীপ। কিন্তু দখল ও প্যারাবন নিধনের কারণে দ্বীপটি আজ বিপর্যস্ত। আপনি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই প্যারাবন নিধনকারীদের বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। অন্যদিকে দ্বীপটির যোগাযোগ ব্যবস্থাও নাজুক। সোনাদিয়ার পরিবেশ রক্ষা এবং এর সার্বিক উন্নয়নের বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
আলমগীর ফরিদ: "বিগত সরকারের আমলে বেজা (BEZA)-এর হাতে ছেড়ে দিয়ে সোনাদিয়াকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সেখানে ৩৪টি অবৈধ প্রজেক্ট হয়েছে, যা এই সুন্দর দ্বীপটির অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে। এমনকি উন্নয়নের নামে সেখানে বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হলেও কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি—এটি রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। বর্তমানে দ্বীপটিকে বেজার নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা হয়েছে।
সোনাদিয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের বড় ধরনের পর্যটন পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াত সীমিত হয়ে পড়ায় সোনাদিয়া একটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে। আমরা যদি সঠিক পরিকল্পনায় চ্যানেল ও অবকাঠামো তৈরি করে সোনাদিয়াকে পর্যটন এরিয়া হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তবে প্রচুর বিদেশি পর্যটক আসবে এবং দেশ অনেক বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবে। একইভাবে কুতুবদিয়ার দীর্ঘ ও সুন্দর সমুদ্র সৈকতকেও আমরা পর্যটন শিল্পের জন্য সমৃদ্ধ করতে চাই।
তবে উন্নয়নের আগে আমি পরিবেশ রক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে মহেশখালীবাসীকে রক্ষা করতে প্যারাবন বা বাইন গাছের বিকল্প নেই। তাই যারা বন ও ভূমি খেকো আছে, তাদের আমি আবারও কঠোরভাবে সতর্ক করে দিচ্ছি—জনগণের ভোটে নির্বাচিত এমপি হিসেবে আমি সোনাদিয়ায় কোনো ধরনের অবৈধ দখল বা গাছ কাটা বরদাশত করব না। আমরা নতুন করে বনায়ন সৃষ্টি করব এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করেই সোনাদিয়ার টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করব।"
দৈনিক কক্সবাজার: কুতুবদিয়ায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নিরাপদ সমুদ্রসৈকত এবং মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরসহ এ অঞ্চলে রয়েছে অপার পর্যটন সম্ভাবনা। অথচ পর্যটকদের সুবিধার্থে সরকারি কোনো বড় মেগা প্রকল্প বা ইকো-ট্যুরিজম জোন আজও গড়ে ওঠেনি। একটি আধুনিক ও পর্যটনবান্ধব দ্বীপ গঠনে আপনার মাস্টারপ্ল্যান কী?
আলমগীর ফরিদ: "আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত। মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির থেকে সমুদ্রের যে নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায়, তা যেকোনো পর্যটককে মুগ্ধ করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিগত সরকারগুলো এখানে ইকো-ট্যুরিজম বা আধুনিক পর্যটন সুবিধা গড়ে তুলতে পারেনি। পর্যটকদের থাকার জন্য মানসম্মত কটেজ কিংবা থ্রি-স্টার বা ফাইভ-স্টার হোটেলের অভাব এখনো প্রকট। অথচ এখন রাতেও যোগাযোগ সচল থাকে, যা পর্যটকদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
আমি আমাদের নেতা জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদ সাহেবের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করছি। বর্তমানে সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াতে নানা কড়াকড়ি ও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পর্যটন পিপাসু মানুষ তো আর ঘরে বসে থাকবে না। আমরা যদি মহেশখালী, সোনাদিয়া ও কুতুবদিয়াকে সমন্বিত পর্যটন জোনের আওতায় এনে আধুনিক ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র ও আবাসন সুবিধা গড়ে তুলি, তবে এগুলোই হবে পর্যটকদের বিকল্প আকর্ষণ। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে এই অঞ্চলের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাব।"
দৈনিক কক্সবাজার: দুই দ্বীপ উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তনে আপনার পরিকল্পনা কী?
আলমগীর ফরিদ: মহেশখালী সেতু এবং কুতুবদিয়া চ্যানেলে নিরাপদ ফেরি সার্ভিস চালু করা হবে। মহেশখালীর গোরকঘাটা-জনতাবাজার সড়ক এবং কুতুবদিয়ার প্রধান সড়কগুলোকে দুই লেনে উন্নীত করা হবে। গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে এখানে রেললাইন এবং উড়াল সেতুর পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। সালাউদ্দিন ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা কক্সবাজারকে একটি আধুনিক মডেল হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্থান দেব।
দৈনিক কক্সবাজার: মহেশখালীতে অপরাধ সংগঠনের খবর প্রায়ই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়, খুনের ঘটনাও কম ঘটে না। মহেশখালীর পাহাড়ে অপরাধীদের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনমনে স্বস্তি ফেরাতে আপনার পরিকল্পনা কী?
আলমগীর ফরিদ: "মহেশখালীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে খুনাখুনির ঘটনা নিয়ে আমরা যারা রাজনীতি করি এবং আপনারা যারা সাংবাদিক আছেন—সবাই সবসময় চিন্তিত থাকি। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়েও শুধু কালারমারছড়া এলাকাতেই বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। কালারমারছড়ার একদিকে পাহাড় এবং অন্যদিকে লবণের মাঠ হওয়ায় সন্ত্রাসীরা সেখানে সহজেই আশ্রয় নিতে পারে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী অনেক সন্ত্রাসী এখন ওই পাহাড়ে আত্মগোপন করে পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেকবার সেখানে অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু অনেক সময় তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অপরাধীরা আগেই সটকে পড়ে। এলাকার শান্তি ফেরাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই বর্তমানে আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে চুরি ও ছিনতাই রোধে আমি স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। একই সাথে আমি আমার নেতাকর্মীদেরও নির্দেশ দিয়েছি যাতে তারা নিজ নিজ এলাকায় পাহারার ব্যবস্থা করে। অপরাধীরা বাইরে থেকে আসে না, আমাদের সমাজেরই কেউ না কেউ এর সাথে জড়িত। তাই অপরাধ দমনে আমরা প্রশাসন ও জনগণ মিলে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলব। মহেশখালীকে সন্ত্রাস ও অপরাধমুক্ত করতে আমি বদ্ধপরিকর।"
দৈনিক কক্সবাজার: আগামী পাঁচ বছরে মহেশখালী-কুতুবদিয়াকে একটি আধুনিক ও মডেল আসন হিসেবে গড়ে তুলতে আপনার প্রধান অগ্রাধিকারমূলক কাজ কী কী হবে?
আলমগীর ফরিদ: "আগামী পাঁচ বছরে আমার লক্ষ্য মহেশখালী-কুতুবদিয়াকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আধুনিক জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা। আমার প্রধান অগ্রাধিকারগুলো হলো—প্রথমত, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে উপকূলবাসীকে জলোচ্ছ্বাস থেকে স্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে চাষিদের ভাগ্য পরিবর্তন করা। তৃতীয়ত, মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু এবং কুতুবদিয়ায় ফেরি সার্ভিস চালুর মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানো।
সড়ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গোরকঘাটা-জনতাবাজার সড়ক এবং কুতুবদিয়ার আজম সড়ককে দুই লেনে উন্নীত করা হবে। এছাড়া জনবহুল বাজারগুলোতে যানজট নিরসনে আমরা বিকল্প সড়কের পরিকল্পনা করছি। সুপেয় পানির সংকট নিরসনে ইতিমধ্যে কয়েকটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপিত হয়েছে, আগামীতে এর সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল যাতে স্থানীয়রা ভোগ করতে পারে এবং একটি সুশৃঙ্খল, সন্ত্রাসমুক্ত ও উন্নয়নবান্ধব মডেল নির্বাচনী এলাকা হিসেবে এ আসনটি পরিচিতি পায়, সেভাবেই আমি কাজ করে যাব।"
দৈনিক কক্সবাজার: সবশেষে জনগণের উদ্দেশ্যে আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি?
আলমগীর ফরিদ: আমি আপনাদের সংসদ সদস্য নয়, বরং খাদেম হিসেবে পরিচিত হতে চাই। আপনারা শান্ত থাকুন, মহেশখালী-কুতুবদিয়াকে গড়ার সুযোগ দিন। আমি একটি সন্ত্রাসমুক্ত, কর্মসংস্থান সমৃদ্ধ আধুনিক মডেল আসন উপহার দিতে চাই। আপনাদের সবার দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি।
দৈনিক কক্সবাজার: আপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় আমাদের দেওয়ার জন্য এবং খোলামেলা আলোচনার জন্য 'দৈনিক কক্সবাজার' পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আগামী দিনের পথচলায় আপনার সাফল্য কামনা করছি।
আলমগীর ফরিদ: "আপনাদেরও ধন্যবাদ। দৈনিক কক্সবাজার পরিবারকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি কষ্ট করে এসে আমাদের মহেশখালী-কুতুবদিয়ার কথাগুলো দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য। আপনাদের মাধ্যমে আমি সবার কাছে দোয়া চাই। সত্যি বলতে, নির্বাচনের পর আমি মাঝে মাঝে গভীর রাতে ঘুম থেকে চমকে উঠি—যাকে আমাদের চাটগাঁইয়া ভাষায় বলে 'ছেঁহা খাওয়া'।
আমি ভাবি, ১৭টি পয়েন্টের যে বিশাল নির্বাচনী ইশতেহার আমি দিয়েছিলাম, তার প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্ব এখন আমার কাঁধে। মানুষ তো ধানের শীষে ভোট দিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, এখন সব কাজ করার দায়িত্ব আমার। আমি যেন আল্লাহর রহমতে আমার ইশতেহার অনুযায়ী মহেশখালী-কুতুবদিয়াকে নতুন করে সাজাতে পারি, এটাই আমার শেষ চাওয়া। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন।"
শ্রুতিলিখন: মাহবুব রোকন।