কক্সবাজারের উপকূল দিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারকারী চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। টেকনাফ ও উখিয়ার পাশাপাশি কক্সবাজারের আরও কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় দালালদের তৎপরতার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পুরুষদের মালয়েশিয়ায় কাজের প্রলোভন এবং রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের বিয়ের আশ্বাস দিয়ে পাচারের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
সর্বশেষ গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে সেন্টমার্টিন ও আশপাশের সমুদ্র এলাকায় টহলের সময় নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ ১৬ জন রোহিঙ্গা ও ৪৯ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে। তাঁদের মধ্যে চারজন রোহিঙ্গা নারী ছিলেন। এ ঘটনায় ১১ জনকে আটক করা হয়—আটজন রোহিঙ্গা ও তিনজন বাংলাদেশি।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে টেকনাফের বাহারছড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে নারী-পুরুষসহ ১৮ জনকে উদ্ধার করে পুলিশ ও কোস্টগার্ড। তাঁদের মধ্যে দুজন রোহিঙ্গা ও ১৬ জন বাংলাদেশি। পুলিশ বলছে, মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁদের সেখানে জড়ো করা হয়েছিল। পুলিশ উপস্থিতির খবর পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যায়।
দুটি ঘটনাতেই একটি বিষয় স্পষ্ট-উপকূলীয় এলাকায় লোকজনকে জড়ো করে সমুদ্রপথে পাঠানোর প্রস্তুতি এখনো চলছে।
ছোট নৌকা থেকে বড় ট্রলারে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাচারকারীরা সাধারণত এক জায়গায় সবাইকে জড়ো করে না। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় গ্রাম থেকে ছোট ছোট দলে সম্ভাব্য যাত্রীদের আনা হয়। পরে তাঁদের টেকনাফের দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় নেওয়া হয়।
রাতে ছোট মাছ ধরার নৌকায় করে তাঁদের গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ বড় ট্রলারে তুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া, মারিশবনিয়া ও নোয়াখালীপাড়া এবং উখিয়ার জালিয়াপালং, মনখালী ও ইনানীসহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকার নাম স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া গেছে।
পাচারকারীরা শুধু বাংলাদেশি তরুণদের নয়, রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষদেরও লক্ষ্য করছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা নারীদের বিয়ের প্রলোভন দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
মালয়েশিয়ায় পৌঁছেই বদলে যায় পরিস্থিতি
পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেকের পরিস্থিতি বদলে যায়। তাঁদের কেউ কেউ চক্রের হাতে জিম্মি হন এবং পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
রামুর খুনিয়াপালং এলাকার তরুণ কাজলের পরিবারের অভিযোগ, কাজলসহ তিন তরুণকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পর একটি চক্র তাঁদের আটক করে। প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে দাবি করা হয়। পরিবারের সদস্যরা গবাদিপশু বিক্রি, জমি বন্ধক ও চাঁদা তুলে চার লাখ টাকার বেশি জোগাড় করে স্থানীয় এক দালালের হাতে দেন।
পরিবারের দাবি, ওই টাকা নির্যাতনকারীদের কাছে পৌঁছানো হয়নি। পরে নির্যাতনের একপর্যায়ে কাজল মারা যান। তাঁর এক সহযাত্রী মালয়েশিয়ার কারাগারে আছেন এবং অন্যজন দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন বলে পরিবার জানিয়েছে।
কাজলের মা বলেন, 'আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই। আমার সব শেষ হয়ে গেছে।'
বাহারছড়ার ৮০ বছর বয়সী ছুরা খাতুনের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ। ১৫ বছর আগে তাঁর ছেলে আলী দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর আর ফেরেননি। তিন ছেলে ও স্ত্রী রেখে জীবিকার সন্ধানে দেশ ছাড়েছিলেন আলী।
রোহিঙ্গা নারীদের লক্ষ্য করে নতুন কৌশল
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কয়েকজন মাঝির ভাষ্য, মালয়েশিয়ায় থাকা রোহিঙ্গা পুরুষদের মধ্যে বিয়ের জন্য নারী খোঁজার প্রবণতাকে কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা। এ জন্য ক্যাম্পে গিয়ে নারীদের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, কোনো পরিবার রাজি হলে কয়েক দফা যোগাযোগের পর দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। এরপর নারী ও কিশোরীদের ছোট দলে উপকূলীয় এলাকায় এনে নৌকায় তুলে দেওয়া হয়।
তবে বিয়ের প্রস্তাবের আড়ালে কতজন নারী পাচারের শিকার হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
১৫ বছরেও নিখোঁজের হিসাব নেই
সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের ঘটনা নতুন নয়। ২০১১ সাল থেকেই এ পথে মানুষের যাওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী জঙ্গলে পাচারকারীদের ক্যাম্প ও গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই রুটে মানব পাচারের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে।
পরবর্তী সময়ে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করায় কিছু সময়ের জন্য এই রুটে তৎপরতা কমেছিল। কিন্তু রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর কক্সবাজার উপকূলকে কেন্দ্র করে নতুন করে পাচারচক্র সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বর্ষা শেষে সমুদ্র শান্ত হলে এই তৎপরতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
গ্রেপ্তার হচ্ছে, মূল হোতারা অধরা
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার করলেও পাচারচক্রের মূল সংগঠকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়া কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে যুক্ত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টা করছে দালাল চক্র। সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় বিজিবির নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মানব পাচার ও অপহরণের বিরুদ্ধে পুলিশ সতর্ক রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, সমুদ্রপথে মানব পাচার দেশের ভাবমূর্তি ও বৈধ শ্রমবাজার—দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতি করছে।
তাঁর মতে, শুধু পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দেশে ও বিদেশে থাকা পাচারের মূল হোতাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁদের অবৈধ সম্পদ জব্দ করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
সমুদ্রপথে পাচার ঠেকাতে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু উপকূল পাহারা নয়; দালাল নিয়োগকারী, অর্থদাতা, নৌযান নিয়ন্ত্রণকারী এবং দেশের বাইরে থাকা পাচারচক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।