কক্সবাজারের মহেশখালী সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে এক রাতে ছয়টি মাছ ধরার ট্রলারে জলদস্যুরা হামলা চালিয়ে মাছ, জাল, জ্বালানি তেল, খাবার-রসদসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় জেলেদের মারধরও করা হয়। হামলায় অন্তত ১০ জনের বেশি জেলে আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
কালারমারছড়া জেলে কল্যাণ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির দাবি, হামলার পর তিনটি ট্রলারের ২৪ জেলে ও মাঝি-মাল্লার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তবে নিখোঁজের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি কোস্টগার্ড।
জেলে ও ট্রলার মালিকদের ভাষ্য, গত রোববার রাতে মহেশখালী সংলগ্ন সাগরে মাছ ধরার পর ফেরার পথে ছয়টি ট্রলারে হামলা চালায় জলদস্যুরা। অস্ত্রের মুখে জেলেদের জিম্মি করে মারধরের পর ট্রলারে থাকা মাছ, জাল, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম লুট করা হয়। কয়েকটি ট্রলারের ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও খুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হামলার শিকার হয়ে ফিরে আসতে সক্ষম হওয়া কামাল মাঝি বলেন, সন্ধ্যার পর তাঁরা সাগরে জাল তুলছিলেন। এ সময় একটি বড় ট্রলার তাঁদের মাছ ধরার ট্রলারের কাছে এসে থামে। ওই ট্রলারে ২০ থেকে ২২ জনের মতো লোক ছিল। তারা অস্ত্রের মুখে তাঁদের জিম্মি করে ট্রলারে উঠে মারধর শুরু করে।
কামাল মাঝির ভাষ্য, তাঁদের ট্রলারে ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি মাছ ছিল, যার আনুমানিক মূল্য সাড়ে তিন লাখ টাকা। জলদস্যুরা মাছের পাশাপাশি জ্বালানি তেল, খাবার-রসদ, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে যায়। পরে ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়ায় ট্রলার চালাতেও সমস্যা হয়।
তিনি বলেন, হামলার পর আশপাশের ট্রলারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলে কোথাও কোথাও চিৎকার ও ডাকাডাকির শব্দ শোনা যায়। পরে তাঁরা জানতে পারেন, আরও কয়েকটি ট্রলারে হামলা হয়েছে।
কালারমারছড়া জেলে কল্যাণ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসাইন বলেন, গত ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর মহেশখালীর কালারমারছড়ার মোহাম্মদ শাহঘোনার ঘাট থেকে ১০ থেকে ১২টি ট্রলার গভীর সাগরে মাছ ধরতে যায়। চার-পাঁচ দিন মাছ ধরার পর ফেরার পথে ছয়টি ট্রলারে হামলার ঘটনা ঘটে।
আমির হোসাইনের দাবি, হামলায় অন্তত নয়জন জেলে ও ট্রলার মালিক আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রকিয়ত উল্লাহ মাঝি, নুর আলম বহদ্দার, আশেক উল্লাহ কালু বহদ্দার, বেলাল হোসেন মাঝি, জয়নাল বহদ্দার, কামাল হোসেন, নুরুল আবছার বহদ্দার, মাহামুদুল হক ও সাইফুল রয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের কয়েকজন স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন, আর তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তিনটি ট্রলারের ২৪ জেলে ও মাঝি-মাল্লার এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ ট্রলারগুলোর মধ্যে ওবায়দুল হক বহদ্দারের দুটি এবং আহমদ উল্লাহ বহদ্দারের একটি ট্রলার রয়েছে। প্রতিটি ট্রলারে প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ টাকা করে ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
জেলেদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে মহেশখালী, সোনাদিয়া ও কুতুবদিয়া সংলগ্ন সাগরে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। এতে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সাগরে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর টহল আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মহেশখালী থানার পরিদর্শক (ওসি) মোহাম্মদ সুলতান বলেন, মহেশখালী সোনাদিয়া থেকে সাগরে জলদস্যুতার ঘটনার খবর শুনেছি। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ কোন কিছু অবহিত করেনি। তারপরও পুলিশের টিম কাজ করছে। এছাড়াও ৩টি ট্রলারের ২৪ জন জেলে নিখোঁজের বিষয়টিও কেউ কিছুই জানায়নি। এরপরও সব বিষয় বিবেচনা করে পুলিশ কাজ করছে।
এদিকে সাগরে জলদস্যুতা ও চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে টহল জোরদারের কথা জানিয়েছে কোস্টগার্ড। সংস্থাটি বলছে, আধুনিক জাহাজ ও স্পিডবোটের পাশাপাশি রাডার ও জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি করা হচ্ছে।
কোস্টগার্ডের অপারেশন কর্মকর্তা লে. কমান্ডার আরাফাত হোসেন বলেন, মহেশখালী সংলগ্ন সাগরে হামলার বিষয়ে তাঁরা বিভিন্নজনের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছেন। এসব তথ্য যাচাই করে জলদস্যুদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এর মধ্যেই কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাঁচটি দেশীয় তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৭ রাউন্ড গুলিসহ তিনজনকে আটক করেছে কোস্টগার্ড। সোমবার মধ্যরাতে বদরখালী ইউনিয়নের বদর আউলিয়া ঘাটসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন মোহাম্মদ তানভীর (২১), মো. রুকমদ্দিন (৪২) ও আকতার আহমেদ (৭৮)। তাঁরা চকরিয়ার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
কোস্টগার্ড জানায়, সাগরে অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজ ও মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতির উদ্দেশ্যে কয়েকজনের অবস্থানের খবর পেয়ে অভিযান চালানো হয়। কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে পাঁচ থেকে ছয়জন পালানোর চেষ্টা করেন। পরে ধাওয়া দিয়ে তিনজনকে আটক করা হয়। তাঁদের হেফাজত ও আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে পাঁচটি বন্দুক ও ১৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
লে. কমান্ডার আরাফাত হোসেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিরা অস্ত্রগুলো বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পাশাপাশি তাঁরা বিভিন্ন সময় ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
কোস্টগার্ডের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ওই ব্যক্তিরা ছোট নৌকা ব্যবহার করে মাছ ধরার ট্রলার বা বাণিজ্যিক জাহাজের আশপাশে অবস্থান নেন। নোঙর করা কিংবা কম গতিতে চলাচলকারী জাহাজে দড়ির সাহায্যে উঠে লোহা, পেইন্ট, গ্রিজসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে তাঁরা কোনো পুরোনো সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্রের সদস্য-এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে চকরিয়া থানায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।
জেলেদের ভাষ্য, সাগরে মাছ ধরার মৌসুমে জলদস্যুদের এমন তৎপরতা অব্যাহত থাকলে তাঁদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। তাই জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করে জেলেদের জন্য নিরাপদ সাগর নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।