দীর্ঘ ১০ মাসের বিরতি শেষে আবারও পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। নীল সমুদ্র, স্বচ্ছ জলরাশি আর দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। পর্যটকদের আগমনে বেড়েছে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটননির্ভর এই দ্বীপে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরায় স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও।
সেন্টমার্টিনের স্বচ্ছ নীল জলরাশি, শান্ত সমুদ্র আর দিগন্তজোড়া সৌন্দর্য মুগ্ধ করছে পর্যটকদের। ছোট ছোট ঢেউয়ের সঙ্গে উপকূলে ভিড়ছে ডিঙি নৌকা। প্রকৃতির এমন রূপ উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দ্বীপে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য দ্বীপটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। শুক্রবার (০৬ নভেম্বর) দ্বিতীয় দিনে এই ৩ জাহাজে করে সর্বমোট ১৫৫৮ জন পর্যটক সেন্টমার্টিন যান। যার মধ্যে এমভি বারো আউলিয়ায় ৬১৯ জন, এমভি কর্ণফুলীতে ৩৮৭ জন এবং এমভি টেকনাফে ৫৪৮ জন পর্যটক ছিলেন। আর বৃহস্পতিবার (০৫ নভেম্বর) চলতি পর্যটন মৌসুমে প্রথম দিন একটি জাহাজে করে ৮৩০ জন কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনে পৌছায়। কক্সবাজার থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রা শেষে সেন্টমার্টিনে পৌঁছেই অনেকে মেতে উঠছেন দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগে। কারও কাছে এটি প্রথম সমুদ্র দেখার অভিজ্ঞতা, কারও কাছে নীল জলরাশির মাঝে আনন্দঘন সময় কাটানোর সুযোগ।
প্রথমবার সমুদ্র দেখতে এসে উচ্ছ্বসিত পর্যটক তামান্না রহমান। তিনি বলেন, ‘এর আগে কখনো সমুদ্র দেখা হয়নি। জীবনে প্রথমবার সমুদ্র দেখতে এসে -সেন্টমার্টিনের মতো সুন্দর একটি জায়গায় আসতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। এটি আমার জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তার ওপর প্রথমবার দ্বীপে এসে ফুল উপহার পেয়ে আনন্দটা যেন আরও বেড়ে গেছে।’
পর্যটক ফারাহ খানম বলেন, ‘এখানকার নীল সমুদ্রের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। এই সুন্দর পরিবেশে অনেক ছবি তোলার ইচ্ছা রয়েছে। বিশেষ করে সেন্টমার্টিনে গিয়ে বেশি বেশি ছবি তুলব, যাতে এই সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে পারি।’
সমুদ্রের সৌন্দর্যে মুগ্ধ আরেক পর্যটক হাবিব উল্লাহ বলেন, ‘এখানে এসে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি ভালো লাগছে, তা হলো সমুদ্রকে এত কাছ থেকে এবং এত সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারব, তা কখনো কল্পনাও করিনি। আমরা খুবই আনন্দিত। পাশাপাশি আমরা সবাই চাই, দ্বীপের এই অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ যেন অক্ষুণ্ন থাকে। তাই পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যেকেরই সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।’
দ্বীপের বাজার ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতেও ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য। দীর্ঘ ১০ মাস পর্যটক না থাকায় হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও পরিবহন খাতে যে স্থবিরতা ছিল, পর্যটকদের আগমনে তা কাটতে শুরু করেছে। হোটেলকর্মী, ইজিবাইকচালক, দোকানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে।
দ্বীপের হোটেল ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘ ১০ মাসের প্রতীক্ষার পর আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সেন্টমার্টিন। এতে আমাদের ব্যবসায়িক ব্যস্ততা অনেক বেড়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকদের আগমনে আমরা আনন্দিত এবং নতুন করে আশার আলো দেখছি।’
ইজিবাইকচালক রফিক বলেন, ‘এখন পর্যটকদের আগমন শুরু হওয়ায় আমাদের কাজের ব্যস্ততা বাড়বে। পর্যটকের সংখ্যা যত বাড়বে, আমাদের আয়ও তত বাড়বে বলে আশা করছি। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের আগমনে আমরা বেশ আশাবাদী।’
পর্যটকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত খাবার পরিবেশনের চেষ্টা করছেন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরাও। ব্যবসায়ী শাহাবউদ্দিন বলেন, ‘পর্যটকদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আমরা সব সময় আন্তরিকভাবে কাজ করার চেষ্টা করি। খাবারের মান বজায় রাখার পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো খাবার পরিবেশনের ওপর গুরুত্ব দেব, যাতে পর্যটকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে খাবার খেতে পারেন।’
পর্যটকদের সেবা ও হয়রানিমুক্ত ভ্রমণ নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। সেন্টমার্টিন দ্বীপের হোটেল-রিসোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি কেফায়েত উল্লাহ বলেন, পর্যটকেরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, নির্বিঘ্নে দ্বীপে চলাফেরা করতে পারেন এবং যথাযথ সেবা পান, সে বিষয়ে তাঁরা নজরদারি করছেন। পর্যটকেরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।
পর্যটকদের আগমনের পাশাপাশি দ্বীপের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে পুলিশ ও কোস্টগার্ড।
সেন্টমার্টিন পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সরওয়ার উদ্দিন বলেন, দ্বীপের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন অব্যাহত থাকবে।
সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ড স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মারুফ আহমেদ সৌখিন বলেন, দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ড কাজ করছে। পর্যটকবাহী জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চগতিসম্পন্ন বোটের মাধ্যমে নিয়মিত টহল দেওয়া হচ্ছে। যাত্রাপথে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাড়া দিতে কোস্টগার্ডের জাহাজ ও বোট প্রস্তুত রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটক ও যাত্রীদের সহায়তায় কোস্টগার্ড সদস্যরা তৎপর রয়েছেন।
প্রায় আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্টমার্টিন দ্বীপে বসবাস করেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ। তাঁদের বড় একটি অংশের জীবিকা পর্যটননির্ভর। ফলে পর্যটকদের আগমন দ্বীপের মানুষের জন্য যেমন অর্থনৈতিক স্বস্তি নিয়ে এসেছে, তেমনি দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। পর্যটন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার পাশাপাশি দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।