মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট কক্সবাজার উপকূলে চরমভাবে প্রভাব ফেলেছে। নদীর ভাসমান পেট্রোল পাম্পগুলোতে ডিজেল নেই, ফলে হাজার হাজার জেলে এখন সাগরে যেতে পারছেন না। তবে এই সংকট নিরসনে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতি ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মাঝিরঘাট উপকূল। নদীতে ভাসমান পেট্রোল পাম্প, কিন্তু গত ৩ দিন ধরে এই পেট্রোল পাম্পে নেই ডিজেল। যার কারণে পলিথিন মুড়িয়ে বন্ধ করা হয়েছে পাম্পটি। তারপরও জ্বালানি তেলের অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন খুরুশকুল এলাকার তছলিম মাঝির মালিকানাধীন এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলে দিদারুল আলম।
তিনি বলেন, “আমরা তো গরিব মানুষ। পেটের দায়ে জীবনঝুঁকি নিয়েই সাগরে মাছ ধরতে যাই। সাগরে যাওয়া সহজ নয়, সেখানে অনেক ঝুঁকি থাকে। তবুও সংসারের কথা ভেবে, স্ত্রী-সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আমাদের সাগরে যেতে হয়। কিন্তু এখন সাগরে যাওয়ার জন্য তেলের ঘাটে এসে দেখি তেল নেই, পাম্প বন্ধ। তেল না পেলে আমরা সাগরে যাব কীভাবে? আর সাগরে যেতে না পারলে সংসারই বা চালাবো কীভাবে? শুধু আমি একা নই, আমার ওপর নির্ভর করছে বাড়ির অনেক মানুষ। আমরা যদি মাছ ধরতে না পারি, আয় না হয়, তাহলে পরিবারকে কীভাবে খাওয়াবো? এখন তেলের আশায় বসে আছি। কবে তেল পাবো, কবে সাগরে যেতে পারবো-সেটাও জানি না।”
শুধু বাঁকখালী নদীর মাঝির ঘাট নয়, নদীর উপকূলে আছে মোট ২১টি ভাসমান পেট্রোল পাম্প। এই পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে কক্সবাজারের কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলার। কিন্তু অনেক পাম্প গত সাতদিন ধরে বন্ধ, আবার কিছু পাম্প তিনদিন ধরে চালু নেই। ফলস্বরূপ, নদীর তীরে এসে ট্রলারগুলো তেল পেতে পারছে না। এর কারণে নদীতে নোঙর করা ট্রলারের সারি দেখা যাচ্ছে, আর এসব ট্রলারে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার জেলে।
বাঁকখালী নদীর চেয়ারম্যান ঘাট এলাকায় নোঙ্গর করা এফবি শাহ মজিদিয়া ট্রলারের মাঝি আব্দু শুক্কুর বলেন, “আমরা তেল নেওয়ার জন্য পাম্পে এসে খোঁজ নিচ্ছি, কিন্তু এখানে তেল আসেনি। পাম্পের লোকজনও বলছে, তেল না থাকলে তারা দেবে কোথা থেকে। তেল ছাড়া তো সাগরে যাওয়া সম্ভব নয়। তেলের আশায় আমরা দুই দিন ধরে ঘাটে অপেক্ষা করছি। আমাদের ট্রলারের জন্য প্রায় দুই হাজার লিটার তেল প্রয়োজন, কিন্তু তেল না পাওয়ায় সাগরে যেতে পারছি না।”
জেলে মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “৬ নম্বর ঘাটে নদীতে নোঙর করে রাখা ট্রলারগুলোতে প্রায় ৫০০ জেলে বেকার বসে আছি। এই ৫০০ জেলের আয়ের ওপর অন্তত ৫ হাজার মানুষের সংসার চলে। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে গত পাঁচ দিন ধরে আমরা ট্রলারে বসে আছি, সাগরে যেতে পারছি না। ট্রলার মালিকরাও কোনো টাকা দিতে পারছেন না। তারা বলছেন, সাগরে গিয়ে মাছ ধরতে না পারলে টাকা দেবেন কীভাবে। এতে আমরা খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।”
টুলুর ঘাট এলাকায় নোঙর করা এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের মাঝি নেজাম উদ্দিন বলেন, “আমাদের তো সাগরে যেতেই হবে। সাগরে না গেলে সংসার চলবে কীভাবে? ঘরে স্ত্রী-সন্তান আছে, তাদের খাওয়াবো কী দিয়ে? এখন এমন অবস্থা যে কারও কাছে সাহায্য চাইব, সেটাও পারছি না। ঈদও সামনে, কিন্তু ঘরে কিছুই দিতে পারছি না। সাগরে যেতে না পারায় আয়-রোজগার বন্ধ। ”
বাঁকখালী নদীর ৬ নম্বর ঘাটে নোঙ্গর করা এফবি মরিয়ম ট্রলারের জেলে ছৈয়দ নুর বলেন, “এখন আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তেল সংকট। সাগরে মাছ ধরতে যেতে হলে অনেক তেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেল না থাকলে আমরা সাগরে যেতে পারবো না। আর সাগরে যেতে না পারলে আমাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই দ্রুত তেলের ব্যবস্থা করা খুব জরুরি।”
বাঁকখালী নদীর চেয়ারম্যানঘাট এলাকার ফারিয়া ট্রেডিং পাম্পের ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “প্রায় সাত থেকে আট দিন ধরে তেলের সংকট চলছে। আমাদের পাম্পে প্রতিদিন ন্যূনতম প্রায় ৯ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে তেল সরবরাহ একেবারেই কমে গেছে, প্রায় আসছেই না। এ কারণে যেসব মাছ ধরার ট্রলার তেল নিতে আসছে, তাদেরকে আমরা তেল দিতে পারছি না। সাধারণত একটি ট্রলার সাগরে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত তেল মজুত করে নেয়। আগে যেসব ট্রলার মজুত থাকা তেল নিয়ে সাগরে গেছে, তারা হয়তো এই ট্রিপ শেষ করে ফিরতে পারবে। কিন্তু এরপর যদি তেলের সংকট না কাটে, তাহলে তাদের জন্য আবার সাগরে যাওয়া সম্ভব হবে না।”
তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে জ্বালানি তেল সংকট নিরসনে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতি ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি-সাগরে মাছ শিকারে যেতে পারায় অনিশ্চিয়তার মুখে পড়েছে লাখো জেলে পরিবার।
কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতি লিমিটেডের মুখপাত্র মো. আজাদুর রহমান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন উপকূলের জেলেরা। কক্সবাজারে প্রায় ৬ হাজার মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। কিন্তু তেলের অভাবে সেগুলো সাগরে যেতে পারছে না। গত ৩ দিন ধরে আমরা বিভিন্ন ঘাটের ২১টি ভাসমান পাম্পে খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু কোথাও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেল না থাকলে ট্রলার সাগরে পাঠানোর কোনো উপায় নেই।
আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, দ্রুত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক। নইলে প্রায় এক থেকে দুই লাখ জেলে পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়বে।”
পেট্রোল পাম্প মালিকরা জানায়- কক্সবাজার উপকূলের মাছ ধরার ট্রলারের জন্য ২১টি পেট্রোল পাম্পে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।