বরিশালে আদালতের এজলাসে ঢুকে হট্টগোল, বেঞ্চে ধাক্কাধাক্কি ও ভাঙচুরের ঘটনায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাকে দ্রুত বিচার আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গত বুধবার দুপুরে আদালত চত্বর থেকে আটক করা হয়েছিল। অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার বাদী হয়ে কতোয়ালি থানায় মামলাটি করেছেন। তাকে অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের বিচারক এস,এম শরীয়তউল্লাহ কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ওই মামলায় আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ পিপি, অতিরিক্ত পিপি, এপিপিদের আসামী করা হয়েছে। সেই দিন থেকে জেলা আইনজীবী সমিতির ডাকে আদালত বর্জন চলছে। বিচারপ্রাথী সাধারণ মানুষের হয়রানী চরম আকার ধারন করেছে। বরিশালের ঘটনায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মির্জা সিরাজুল ইসলামসহ সমিতির ৯জন আইনজীবীর প্রতি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মোঃ আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত আদালত অবমাননার রুল দেন এবং ১০ দিনের মধ্যে তাদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
পেশাগতভাবে কেবলমাত্র আইনজীবীদেরকেই ’বিজ্ঞ’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়। তাই আইনজীবীদের কাজে-কর্মে-আচরণে বিজ্ঞতার ছাপ থাকা আবশ্যক। আইনজীবীদের সনদ প্রদানকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ’বাংলাদেশ বার কাউন্সিল’ কর্তৃক নির্ধারিত আইনজীবীদের জন্য অবশ্যই পালনীয়, অনুসরণীয় আচরণবিধি আছে। উক্ত আচরণবিধির প্রথম অধ্যায়ের ১-১১ ধারায় আছে একজন আইনজীবীর অন্যান্য আইনজীবীদের প্রতি আচরণ, দ্বিতীয় অধ্যায়ে ১-১৪ ধারায় আছে মক্কেলের প্রতি আচরণ, তৃতীয় অধ্যায়ে ১-৯ ধারায় আছে আদালতের প্রতি আচরণ ও কর্তব্য এবং চতুর্থ অধ্যায়ে ১-৮ ধারায় আছে জনগণের প্রতি আচরণ। প্রত্যেক আইনজীবীর জন্য আচরণবিধি মেনে চলা বাধ্যতামূলক। আচরণবিধির কোন ধারা অমান্য করলে বা লংঘন করলে তা হবে পেশাগত অসদাচরণ। কোন আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার করে দোষী প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত আইনজীবীকে শাস্তি দিতে পারেন। দোষী সাব্যস্থ হলে আইন পেশা থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বহিস্কার করতে বা সনদ স্থগিত করতে বা চিরকালের জন্য আইনপেশায় বারিত করতে পারে। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত উগ্র আইনজীবীরা কি উক্ত আচরণবিধি মেনে চলেন?
আমি বিগত ৪৬ বছর ধরে আইন পেশায় নিয়োজিত আছি। ১৯৮৮ সালে কক্সবাজার জেলার দ্বিতীয় পাবলিক প্রসিকিউটর নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। সব ঘটনা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সততার সাথে বিচার বিশ্লেষন করার চেষ্টা করি এবং ১৯৯১ সাল থেকে দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় ’অতিথি কলাম’ লিখে আসছি। আমি কলামে মিথ্যা লিখেছি মর্মে আজ পর্যন্ত কেউ সম্পাদকের কাছে প্রতিবাদলিপি দেননি। লেখার কারণে অসন্তুষ্ট হয়ে কতিপয় অতি অহংকারী আওয়ামী লীগপন্থী অযোগ্য, দুর্নীতিবান্ধব আইন কর্মকর্তা আমার ফাঁসি দাবী করে হাস্যকর মিছিল মিটিং করলেও কেউ আমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন নাই। আমি ১৯৯১ সালে কক্সবাজার জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর থাকা কালে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি নির্বাচিত হই। এই উপমহাদেশে আইনজীবীরাই অধিক রাজনীতি সচেতন মানুষ হিসেবে রাজনীতি করেছেন, দলের নেতা হয়েছেন, দেশের মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু আইনজীবী সমিতিতে বা আদালতে কোন সময় রাজনীতি আনেননি। আদালত প্রাংগনকে দলীয়করণ, রাজনীতিকরণ করেননি। রাজনীতির কারণে আইনজীবীরা নিজেদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেননি। বরং এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সুপ্রীমকোর্ট বারের সভাপতি এডভোকেট শাসশুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাতের আইনজীবী নেতারা একতাবদ্ধ হয়ে লাগাতার সাত বছর (তিনি ১৯৮৩-১৯৮৯ সুপ্রীমকোর্ট বারের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন) আন্দোলন করেছেন এবং সফল হয়েছেন। আইনজীবীদের মধ্যে প্রথম রাজনীতিকরণ, দলীয়করণ শুরু হয় ১৯৯১ সাল থেকে। প্রথম শুরু হয়েছিল জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম দিয়ে। আমি লিখিতভাবে কলাম লেখে দলীয়করণের বিরোধিতা করেছিলাম। ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলাম। পরে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরাও আওয়ামী লীগ আইনজীবী পরিষদ, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ ইত্যাদি নাম দিয়ে রাজনীতিকরণ ও দলীয়করণ শুরু করেছিলেন। পরে জামাতপন্থীরাও এ প্রতিযোগিতায় শরীক হয়েছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবকিছু দলীয়করণ, রাজনীতিকরণের ষোলকলা পূর্ণ করেছিল। আইনজীবী সমিতি থেকে শুরু করে সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত দলীয়করণ করা হয়েছিল। তার কারণে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের প্রায় সকল বিচারপতি পদত্যাগ করেন, যা এ দেশের ইতিহাসে ও বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। আইনাঙ্গন দলীয়করণের কারণে বেগম খালেদা জিয়া, তাঁর পুত্র তারেক রহমান ও অন্যান্য বিএনপি নেতাদের মত আইনী নির্যাতন ভোগ করে ন্যায় বিচার বঞ্চিত এ দেশের ইতিহাসে আগে কেউ হন নাই। বিএনপি আমলে যে ব্যারিষ্টার সাহেবরা অতি উৎসাহী হয়ে দলীয়করণ শুরু করেছিলেন তাদের অনেকেই পরে আওয়ামী লীগ আমলে বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন, বাড়িঘর ছাড়া হয়েছেন। একজন নেতাকে স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধ অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে তা কার্যকর করা হয়েছে। মরহুমের পরিবারের সদস্যরা সংবাদ সম্মেলন করে মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায় আইন মন্ত্রণালয়ে লেখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন। দলীয়করণের ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের নিরপেক্ষতা ও প্রদত্ত রায়ের মারাত্মক সমালোচনা হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।
সমালোচকরা বলেন যে আইনজীবীরা আইনাঙ্গনে রাজনীতিকরণ ও দলীয়করণে শরীক হয়েছেন তারা তাদের বিবেক, মস্তক দলের কাছে, দলীয় প্রধানের কাছে বন্ধক দিয়েছেন। দলীয় প্রধান বা দলীয় নেতারা যা বলবেন তা দলীয়করণকৃত আইনজীবীরা সমর্থন করবেন, বলবেন বা বলতে বাধ্য। তারা স্বাধীনভাবে বিবেক, মস্তক ব্যবহার করতে পারেন না। তাই সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি ও ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির নিয়ন্ত্রিত, পাতানো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলায় বিএনপিপন্থী সিনিয়র আইনজীবীদের জামিন না দিয়ে হাজতে প্রেরণ করলে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা খুশী হয়েছিলেন, সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এখন আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের জামিন নামজ্ঞুর করে কারাগারে প্রেরণ করার আদেশ দিলে বিএনপিপন্থীরা খুশী হন, সন্তোষ্ট হন। আওয়ামী লীগপন্থীদের জামিনযোগ্য ধারার মামলায় জামিন দিলে যদি বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা অসন্তোষ্ট হন, আদালতে ভাঙচুর করেন যা কোন অবস্থাতেই বিধিসম্মত,কাম্য ও গ্রহনযোগ্য নয়। অসন্তুষ্ট ও সংক্ষুব্ধ হলে সংশ্লিষ্ট আদালতে বা উচ্চ আদালতে জামিন বাতিলের দরখাস্ত করেন না কেন? এতে দেশের বিবেকবান সাধারণ দলনিরপেক্ষ আইনজীবীরা হতাশ হন, মর্মাহত হন, অসন্তুষ্ট হন। ফ্যাসিস্টমুক্ত স্বাধীন দেশে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার,আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আইনাংগনকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও সকল ধরনের প্রভাবমুক্ত করা উচিত। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন। জনগণও তারেক রহমানের নেতৃত্বের উপর আস্থাশীল ও আশাবাদী।
আইনজীবীদের মধ্যে রাজনীতিকরণ হওয়ার পর থেকে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে লাখ লাখ টাকা খরচ হয় বলে প্রচার আছে, যা দলীয়করণ, রাজনীতিকরণ হওয়ার আগে কখনও শোনা যায়নি। রাজনীতিকরণ হওয়ার আগে অযোগ্য ব্যক্তি বিচারপতি, আইন উপদেষ্টা, আইন কর্মকর্তা, জিপি, পিপি, আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা শোনা যায়নি। অপরাজনীতি ও আইনাঙ্গনকে রাজনীতিকরণের কারণেই সব কিছু অধিক দুর্নীতিগ্রস্থ হচ্ছে, অসম্ভবও সম্ভব হচ্ছে। অবিলম্বে রাজনীতিকরণকৃত অর্থাৎ আইনজীবী সমিতি ছাড়া রাজনৈতিক দলের লেজুর হিসাবে কোন সমিতি বা সংঘ বা ফোরাম আইনাংগনে গঠন করা সম্পূর্ণ সংবিধান বিরোধী ঘোষণা করা এবং উক্ত দলীয়ভাবে সংগঠিত সংঘের, সমিতির, দলের সদস্য বিচারপতি, আইনকর্মকর্তা, আইন উপদেষ্টা নিযুক্ত হওয়ার জন্য অনিরপেক্ষ ও অযোগ্য ঘোষণা করে অধ্যাদেশ জারী করা হলে ভবিষ্যতে দেশের আইনজীবীদের লজ্জিত, অপমানিত, হতাশ ও বিব্রত হওয়ার মত ঘটনা আইনাঙ্গনে ঘটবে না ।