বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র শহর কক্সবাজার। যেখানে পুরো বছর জুড়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ছুটে আসেন। সমুদ্র কিনারের পাহাড়, ঝর্ণার সৌন্দর্য নিয়ে কক্সবাজার সদর। বৌদ্ধ বিহার, প্রকৃতির ছায়ায় ঘেরা রামু উপজেলা। তার নিকটেই কক্সবাজার সদর থেকে বিছিন্ন করে গঠিত নতুন উপজেলা ঈদগাঁও।
এই ৩ উপজেলা নিয়েই গঠিত কক্সবাজার ৩ সংসদীয় আসন। যে আসনটির মানুষের একটি বিশাল অংশ সমুদ্র নির্ভর। মাছ অহরণ, শুটকি উৎপাদন সহ নানা কারণে সমুদ্র জীবিকা প্রধানতম জীবিকা হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের মানুষের। রয়েছে লবণ মাঠ, পর্যটন নির্ভরশীলতাও।
আসনটি জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত আসন হিসেবে পরিচিত। পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি, রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, সীমান্ত নিরাপত্তা, যানজট ও নগর ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে এই আসনের নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক উত্তাপ দুটোই তুঙ্গে।
ইতিমধ্যে আসনটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি ও জামায়াত সহ ৫টি রাজনৈতিক দল।
এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। এর বিপরীতে আসনটির জামায়াতের প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাহাদুর। তিনি একবার কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে নতুন। এক সময় ছাত্র শিবিরের হয়ে কক্সবাজার কলেজের ভিপি ছিলেন বাহাদুর।
এছাড়া আসনটিতে প্রার্থী হিসেবে বৈধতা পেয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আমিরুল ইসলাম, লেবার পার্টির প্রার্থী জগদীশ বড়ুয়া, আমজনতা দলের প্রার্থী নুরুল আবছার।
প্রার্থী ৫ জন হলে ও দুই প্রার্থীই সমুদ্র শহরের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও জীবিকার প্রশ্নে প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠ তুঙ্গে রেখেছেন।
কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটির মোট ভোটার ৫ লাখ ৪০ হাজার ৬৪৪ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটর ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৩ হাজার ১৫৯ জন এবং ১ জন হিজড়া ভোটার। আসনটির মোট কেন্দ্র ১৭৮টি, যার ৭৮টি সদর উপজেলায়, রামু উপজেলায় ৬৪টি ও ঈদগাঁও উপজেলায় ৩৬টি।
#আগের নির্বাচনে যারা বিজয় হয়েছিলেন :
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ২৯৬ নম্বর আসনটি কক্সবাজার-৩। কক্সবাজার সদর উপজেলা, রামু উপজেলা ও ঈদগাঁও উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির লুৎফুর রহমান কাজল। ওই নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন, ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৭৮ ভোট। পরাজিত আওয়ামীলীগের প্রার্থী সাইমুম সরওয়ার কমল পেয়েছিলেন ৮৬ হাজার ৫৩৬ ভোট। একই নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ সহীদুজ্জামান পেয়েছিলেন ৬৩ হাজার ৬৮ ভোট।
এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনেও আসনটিতে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ সহীদুজ্জামান। ওই নির্বাচনে তিনি পান ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৯৫ ভোট। পরাজিত আওয়ামীলীগের প্রার্থী মোস্তাক আহমদ চৌধুরী পেয়েছিলে ৮ হাজার ৩১২ ভোট। এর আগে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও আসনটি ছিল বিএনপির দখলে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান ৬৯ হাজার ১১৯ ভোটে নির্বাচিত হন। পরাজিত আওয়ামীলীগের প্রার্থী মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী পেয়েছিলেন ৪১ হাজার ৪০৫ ভোট। তারও আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী ৩২ হাজার ১০৬ ভোটে নির্বাচিত হন। পরাজিত বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান পেয়েছিলেন ৩১ হাজার ১০৯ ভোট। এছাড়া ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সংসদ সদস্য ছিলেন মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান।
সব মিলিয়ে ৪ বার বিএনপির দখলে থাকা আসনটির এবার বিএনপির প্রার্থী লুৎফুর রহমান কাজল। এই আসনের ভোটের মাঠে দক্ষ প্রার্থী হিসেবে দীর্ঘদিন মাঠে তৎপর রয়েছেন তিনি। এর বিপরীতে আসনটির জামায়াতের প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাহাদুর। তিনি একবার কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে নতুন। এক সময়ের ছাত্র শিবিরের হয়ে কলেজের ভিপি বাহাদুর কতটুকু প্রতিদ্বন্দিতা করবেন বিএনপির কাজলের বিপক্ষে এটাও এখন আলোচনার বিষয়।
আলোচনা যা হোক বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর পরই লুৎফুর রহমান কাজলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাহাদুর। আর কাজলও প্রতিউত্তরে বাহাদুরকে অভিনন্দন ও শুভ কামনা জানিয়েছেন। উভয়েই সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
#প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা
নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যে প্রধান দুই প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। গণসংযোগ, উঠান বৈঠক এবং পাড়া-মহল্লার সভায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বিএনপির প্রার্থী লুৎফুর রহমান গণসংযোগকালে বলেন, “এই এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। আমরা ক্ষমতায় গেলে কক্সবাজার শহরের যানজট নিরসন, রামু-ঈদগাঁওয়ের গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেব।”
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাহাদুর বলেন, “পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সার্বিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দলের কর্মীদের নিয়েই মাঠে আছেন। জনগণ সাড়া দিচ্ছেন।
#ভোটারদের কণ্ঠে প্রত্যাশা :
কক্সবাজার সদর উপজেলার কলাতলী এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম বলেন, “পর্যটন শহর হলেও ছোট ব্যবসায়ীরা ঠিকমতো সুবিধা পায় না। যানজট, অবৈধ দখল আর চাঁদাবাজিতে আমরা অতিষ্ঠ। যেই আসুক, এসব সমস্যার সমাধান চাই।”
রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের কৃষক রহিম উল্লাহ বলেন, “চাষাবাদে খরচ বাড়ছে, কিন্তু ফসলের ন্যায্যমূল্য নেই। গ্রামের রাস্তাঘাট ভালো না হলে উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে কষ্ট হয়। এমপি হলে আগে কৃষকের কথা ভাবতে হবে।”
ঈদগাঁও উপজেলার এক তরুণ ভোটার সাইফুল ইসলাম বলেন, “ডিগ্রি শেষ করেছি, কিন্তু চাকরি নেই। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অনেক শুনেছি, বাস্তবায়ন কম। এবার ভোট দেওয়ার আগে আমরা কাজের নিশ্চয়তা দেখতে চাই।”
এই আসনের নির্বাচনী আলোচনায় কয়েকটি বিষয় ঘুরে ফিরে আসছে, এ গুলো হল কক্সবাজার শহরের যানজট ও নগর ব্যবস্থাপনা, রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও নিরাপত্তা, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলার গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন খাতের স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও কর্মসংস্থান এবং মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এডভোকেট মঈন উদ্দিন বলেন, “এই আসনে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, সুশাসন ও জবাবদিহিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রতিনিধিকে মানুষের কাছে নিয়মিত জবাব দিতে হবে।”
কক্সবাজার সদর, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলায় ধারাবাহিক গণসংযোগকালে বিএনপির প্রার্থী লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, “কক্সবাজার-৩ আসনের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের নামে বঞ্চনার শিকার। পর্যটন শহর হলেও এখানকার সাধারণ মানুষ কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত।”
তিনি বলেন, “আমরা ক্ষমতায় গেলে কক্সবাজার শহরের ভয়াবহ যানজট নিরসন, রামু ও ঈদগাঁওয়ের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।”
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সমস্যার কারণে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, নিরাপত্তা ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সংকটের আন্তর্জাতিক সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।”
গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রসঙ্গে বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, “মানুষ এখন আর কথার রাজনীতি চায় না। তারা চায় ভোটের অধিকার ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রতিনিধি। এই আসনে ভোটের মাধ্যমে পরিবর্তনের সূচনা হবে।”
একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বাহাদুর বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগকালে বলেন, “দেশের মানুষ দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দুঃশাসনের রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। কক্সবাজার-৩ আসনে সৎ, যোগ্য ও আমানতদার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের লক্ষ্য।”
রামু ও ঈদগাঁওয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “গ্রামাঞ্চলের মানুষ ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।”
আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে তিনি বলেন, “কক্সবাজারকে নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নৈতিক রাজনীতির বিকল্প নেই। জনগণের ভোটে আমরা সেই পরিবর্তনের পথ খুলতে চাই।”