আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকী মাত্র ১০ দিন সময়। নির্বাচনের অংশগ্রহনকারী রাজনৈতিক জোট ও দলগুলোর এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এখন নির্বাচনী প্রচারণা তুঙ্গে। দীর্ঘ দিন প্রায় ১৬ বছর ধরে ভোটাধিকার বঞ্চিত দেশবাসী ভোট দেওয়ার জন্য বা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য মুখিয়ে আছেন। নেতাদের লাগামহীন কথাবার্তা ও বক্তৃতা শুনে ভোটারা সন্দিহান দৃষ্টিতে প্রশ্ন করেন ভোট সময়মত হবে তো? নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হলেও তার ফলাফল অংশগ্রহনকারী সকল দল কি মেনে নেবে? দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে তা কি অবাধ-সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য হবে? উল্লেখিত প্রশ্নগুলোর মধ্যে সম্প্রতি টিআইবির নির্বাচনী হলফনামা বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন দেখে জনগণ স্তম্বিত। প্রতিবেদনে উল্লেখিত মতে, নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে দেশে নিবন্ধিত মোট ৬০টি দলের মধ্যে এবার ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ২৯৮টি আসনের মধ্যে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী রয়েছেন ২৮৮ আসনে,জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ২২৪ আসনে,ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখার প্রার্থী ২৫৩টি আসনে,এনসিপির শাপলাকলির প্রার্থী ৩২ আসনে, জাতীয় পার্টির লাঙলের প্রার্থী ১৯২টি আসনে,বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পাটির(সিপিবি) কাস্তের প্রার্থী ৬৫আসনে এবং গণঅধিকার পরিষদের ট্রাকের প্রার্থী রয়েছেন ৯০ আসনে, এলডিপি ১২টি আসনে,জাতীয় পার্টি(জেপি) ১০টি,গণতন্ত্রী পার্টি ১টি,জাসদ ৬টি,জেএসডি ২৬টি,জাকের পার্টি ৭টি,বাসদ ৩৯টি,বিজেপি ৫টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ৮টি,বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ১৩টি, এনপিপি ২৩টি,জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ৪টি,গণফোরাম ১৯টি, গণফ্রন্ট ৫টি,বাংলাদেশ ন্যাপ ১টি,বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ৩টি,ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ১৯টি,কল্যাণ পার্টি ২টি,ইসলামী ঐক্যজোট ২টি,বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস ৩৪টি,বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ২৬টি,জাগপা ১টি,বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ৭টি,খেলাফতে মজলিস ২১টি, বিএমএল ৬টি,মুক্তিজোট ২০টি,বিএনএফ ৮টি,এনডিএম ৮টি,বাংলাদেশ কংগ্রেস ১৮টি,ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ৪২টি,বাংলাদেশ জাসদ ১১টি, বিএসপি ১৯টি,এপি পার্টি ৩০টি,নাগরিক ঐক্য ১১টি,গণসংহতি আন্দোলন ১৭টি,বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ২টি,বিএমজেপি ৮টি,বাংলাদেশ লেভার পার্টি ১৫টি,বিআরপি ১২টি,বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল(মাক্সবাদী) ২৯টি,জনতার দল ১৯টি,আমজনতার দল ১৫টি,বাংলাদেশ সম-অধিকার পার্টি ১টি এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ৩জন প্রার্থী লড়াই করছেন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে মোট ২৪৯ জন প্রার্থী।
সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডিতে ’নির্বাচনে হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি : ত্রয়োদশ সংবদ নির্বাচন-২০২৬’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে ’নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ ও ’নো ইওর ক্যান্ডিডেট’ বা কেওয়াইসি ড্যাশবোর্ড উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে অর্থ পেশিশক্তি এবং ধর্মান্ধতার কাছে নারী প্রতিনিধিত্ব জিম্মি হওয়ার কারণে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রাথীদের অংশগ্রহনের ক্ষেত্রে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা কোনো রাজনৈতিক দলই পূরণ করতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেছে টিআইবি (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ)। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেছেন,ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রার্থীতা ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে,কিন্তু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ ইসলামপন্থী দলের একজনও নারী প্রার্থী নাই। বিএনপিসহ মুল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক জোট রাজনীতির কারণে নারীরা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন। নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে দলগুলোর ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে,অর্থ,পেশিশক্তি এবং ধর্মান্ধতার মতো রাজনৈতিক চালিকাশক্তি। তাই রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহন ও সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ১৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮৯১ জন কোটিপতি ও ২৭ জন শতকোটিপতি রয়েছেন। এতে ২৪৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। মোট বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে ৫৯.৪১ শতাংশই ঋণগ্রস্থ। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৩২.৭৯ শতাংশ ঋণগ্রস্থ। জাতীয় পার্টির ২৬.৯৭ শতাংশ ঋণগ্রস্থ।মোট প্রার্থীদের মধ্যে সাড়ে ২৫ শতাংশই কোন না কোনভাবে ঋণগ্রস্থ আছেন এবং প্রার্থীদের সর্ব মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। মোট প্রার্থীদের ৪৮ শতাংশই ব্যবসায়ী। আইনপেশার ১২.৬১ শতাংশ,শিক্ষকতা পেশার ১১.৫৬ শতাংশ এবং মাত্র ১.৫৯ শতাংশই তাদের পেশা রাজনীতি হিসেবে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এ সব তথ্য দেখে জনগণ পরস্পরকে প্রশ্ন করছেন আগামী সংসদও কি কোটিপতিদের ক্লাব হতে যাচ্ছে? কোটিপতি ব্যবসায়ীরা সংসদে গিয়ে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে আইন প্রণয়ন করবেন। ঋণগ্রস্থরা নিজেদের আগে ঋণমুক্ত না করে জনগণের সেবা করার জন্য চেষ্টা করবেন তা স্বাভাবিক নয়। মাত্র ১.৫৯ শতাংশ আত্মস্বীকৃত পেশাদার রাজনীতিবিদ সকলে বিজয়ী হলেও স্বাভাবিক প্রশ্ন থেকে যায়,আগামী সংসদও কি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে? ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক আদর্শ ও উদ্দেশ্য থাকে মুনাফা বা লভ্যাংশ বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র কি ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিচালিত হবে? রাজনীতিবিদদের দ্বারা দেশ পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা কি আর কোন দিন সৃষ্টি হবে না?
ইতিমধ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহনকারী নেতাদের মুখের ভাষা সম্মানজনক ব্যতিক্রম ছাড়া আগের মতই মারাত্মক অশোভন ও আক্রমণাত্মক রয়ে গেছে। ২০২৪ সালের আত্মবিধ্বংসী, জনস্বার্থ বিরোধী, নষ্ট রাজনীতি ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের প্রেক্ষিতে ফ্যাসিষ্টরা দেশ, জনগণ ও তাদের দলীয় সমর্থকদের অরক্ষিত রেখে সদলেবলে বিদেশে পালিয়ে গেলে দেশে সবকিছুতে পরিবর্তন হবে বলে জনগণ আশা করেছিলেন। কিন্তু এখন নির্বাচনী প্রচারণা দেখে জনগণের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে রাজনীতিবিদদের তেমন চারিত্রিক পরিবর্তন হয় নাই। ইতিমধ্যে সমর্থকদের মধ্যে শক্তিমত্তা দেখাতে গিয়ে কথা কাটাকাটি,একগুয়েমী ও মারামারিতে উভয়পক্ষে অনেকে আহত ও একজন রাজনীতিবিদ খুনও হয়েছেন,যা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও চরম হতাশাজনক । কোন রাজনৈতিক নেতাই কর্মী-সমর্থকদের বলছেন না, আইন ভঙ্গ করা যাবে না,আইন নিজের হাতে নেওয়া যাবে না। দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে আমরা নির্বাচনে পরাজিত হলেও কখনও গণতন্ত্রকে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে, আইনের শাসনকে পরাজিত হতে দেব না।
দেশব্যাপী রাজনীতিবিদরা সুন্দর সুন্দর কথা বললেও তা নিজের উপর প্রয়োগ করেন না। তাদের স্বার্থপর ও মারমুখী আচরণ দেখে আমজনতা বলেন তাদের নীতি হলো,’তোরা যে যা বলিছ ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’ । রাজনীতিবিদদের চারিত্রিক পরিবর্তন তেমন হয় নাই দেখে জনগণ স্তম্বিত ও হতাশ।
তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারণায়। তিনি মনে করেন মানুষ ভোট দেন বিশ্বাস থেকে। মানুষের আস্থাই হলো শক্তি। ভাড়া করা মানুষ নিয়ে মিছিল বা কান ঝালাপালা করে দেওয়া মাইকিং নয়। ২৬ জানুয়ারী তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোষ্টে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন,এই নির্বাচনে যদি দেখিয়ে দেওয়া যায় যে কান ঝালাপালা করা মাইকিং না করে,পোষ্টার দিয়ে শহর জঞ্জাল না করে,কোটি টাকা খরচ করে শোডাউন না দিয়েও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জিততে পারেন,তাহলে ভবিষ্যতে এমন অনেকেই রাজনীতিতে আসবেন,যাদের টাকা বা পেশীশক্তি নেই,কিন্তু দেশ পরিবর্তনের আকাঙ্কা ও যোগ্যতা আছে। আর তখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের পুরানো চর্চা বাদ দিতে বাধ্য হবে। তাঁর প্রতি জনসমর্থন দ্রুত ও ব্যাপক বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তিনি বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তাই কতিপয় রাজনীতিবিদদের দলীয় স্বার্থে ও ব্যক্তি স্বার্থে করা সকল চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও হুমকী উপেক্ষা করে বিবেকবান সকল ভোটারদের যাতে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন সে ব্যাপারে উৎসাহিত করা সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকের দায়িত্ব। দেশ,জনগণ ও দেশের অর্থনীতি রক্ষার স্বার্থে দেশে এখন একটি অবাধ,সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন ও একটি নির্বাচিত সরকার জনস্বার্থে খুবই প্রয়োজন।