কক্সবাজারের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন কক্সবাজার–৪। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি শুধু পর্যটন বা ভৌগলিক কারণে নয়, বরং রোহিঙ্গা সংকট, মাদক ও মানবপাচার, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন বৈষম্যের মতো ইস্যুতে বরাবরই জাতীয় আলোচনায় থাকে।
যে আসনটিকে বলা হয়, লক্ষী আসন। স্বাধীনতা পরবর্তী থেকে এ পর্যন্ত এই আসনটিতে যে দলের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ওই দলই সরকার গঠন করেছে। ফলে সকল সময় এই আসনটিতে ছিলেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য। ফলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এখানকার ভোটের মাঠে ধীরে ধীরে উত্তাপ বাড়ছে।
# সীমান্ত, রোহিঙ্গা, মাদক ও চোরাচালান ইস্যু প্রধান আলোচনায়
২০১৭ সাল থেকে উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থান করছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি। বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মীর সাথে জান্তা সরকারের সংঘাতের জের ধরে এখনও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত আছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকট তাদের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ ও নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের বড় একটি অংশ জানতে চাইছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয়দের ক্ষতিপূরণ বিষয়ে প্রার্থীদের স্পষ্ট অবস্থান কী।
টেকনাফের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু এত বছরেও স্থায়ী সমাধান নেই। নির্বাচিত এমপির কাছে আমাদের প্রথম দাবি—এটার কার্যকর সমাধান।”
মিয়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইয়াবা কারবার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
উখিয়ার আইনজীবী আবদুল মান্নান জানান, “মাদক শুধু তরুণ সমাজ ধ্বংস করছে না, ব্যবসা-বাণিজ্যও অনিরাপদ করে তুলছে। আমরা এমন প্রতিনিধি চাই, যিনি এই বিষয়টা শক্ত হাতে ধরবেন।”
উখিয়া ও টেকনাফে পর্যটন সম্ভাবনা থাকলেও স্থানীয়দের বড় অংশ এখনো কর্মসংস্থানের অভাবে ভুগছে। সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পানির সংকট এখানকার নিত্যদিনের বাস্তবতা। নির্বাচনী প্রচারে প্রার্থীরা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পর্যটন শিল্পে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
তারা চান, রোহিঙ্গা সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান, সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান উন্নয়ন, স্থানীয়দের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান।
টেকনাফ সদরের জেলে আবদুল মালেক (৪৮) বলেন, “সমুদ্রই আমাদের জীবন-জীবিকা। কিন্তু নিরাপত্তা আর নানা বিধিনিষেধের কারণে ঠিকমতো মাছ ধরতে পারি না। প্রায়শই আরাকান আর্মি জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এখনও সেখানে অনেক জেলে বন্দী রয়েছে। এর কোন সমাধান পাচ্ছি না। যে প্রার্থী জেলেদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করবে, তাকেই ভোট দেব।”
উখিয়ার ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম (৩৫) বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্প হওয়ার পর থেকে ব্যবসা যেমন বেড়েছে, তেমনি ঝুঁকিও বেড়েছে। চুরি-ছিনতাই আর মাদকের ভয় থাকে। আমরা চাই, একজন এমপি যিনি আইনশৃঙ্খলা আর স্থানীয় মানুষের স্বার্থ আগে দেখবেন।”
টেকনাফ পৌর এলাকার নারী ফাতেমা বেগম (২৯) বলেন, “হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক পাওয়া যায় না, বাইরে যেতে হলে অনেক দূর। মা ও শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে মানুষের উপকার হতো। এসব বিষয় দেখার মতো জনপ্রতিনিধি দরকার।”
উখিয়ার শিক্ষার্থী মো. সাইফুল্লাহ (২২) বলেন, “এখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ খুব কম। পড়াশোনা শেষ করে চাকরির জন্য জেলা শহরে যেতে হয়। আমরা চাই স্থানীয় পর্যায়ে কলেজ, ট্রেনিং সেন্টার আর চাকরির সুযোগ তৈরি হোক।”
রাশেদা খাতুন (৪১) নামের এনজিওকর্মী বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটে স্থানীয় নারী ও শিশুদের ওপর চাপটা বেশি পড়েছে। শিক্ষা, নিরাপত্তা আর কর্মসংস্থানে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। এই বিষয়গুলো যে গুরুত্ব দেবে, তাকেই ভোট দেব।”
কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের দেয়া তথ্য মতে, কক্সবাজার- ৪ আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৮ হাজার ১৬ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৫৭ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৫৪ জন এবং হিজড়া ভোটার ৫ জন। দুই উপজেলায় মোট কেন্দ্র ১০৭টি। এর মধ্যে উখিয়া-৪৭টি ও টেকনাফ-৬০টি কেন্দ্র রয়েছে।
আসনটি বর্তমানে তিনটি রাজনতিক দল তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী, তিনি আসনটির ৪ বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক হুইপ এই প্রার্থী বর্তমানে জেলা বিএনপি'র সভাপতি। তার বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী দলটির জেলা আমীর নুর আহমদ আনোয়ারী। তিনি টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ৪ বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান।
এছাড়া এই আসনে আরও ৩ জন প্রার্থী রয়েছেন। এরা হলেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী নুরুল হক, জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্রিক আন্দোলন এনডিএম এর প্রার্থী সাইফুদ্দিন খালেদ, লেবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আরাফাত।
তবে প্রার্থী ৫ জন হলেও ঘুরে ফিরে দুই প্রার্থীকেই ঘীরে রয়েছে নানা আলোচনা।
# আগের নির্বাচনে জয়ী যারা :
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ২৯৭ নম্বর আসনটি কক্সবাজার ৪। এই আসনটি গঠিত হয় ১৯৮৬ সালে। এর পূর্বে এটি রামু উপজেলা-টেকনাফ উপজেলা-উখিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত অবিভক্ত চট্টগ্রাম-১৮ আসন ছিল। আসনটি বর্তমানে উখিয়া উপজেলা ও টেকনাফ উপজেলা নিয়ে গঠিত।
যে আসনটির ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন সহ ৪ বারের সংসদ সদস্য ছিলেন শাহজাহান চৌধুরী।
বিগত সংসদ নির্বাচনের বিশ্লেষণ মতে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী আব্দুর রহমান বদির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন বিএনপির এই প্রার্থী। ওই নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী আব্দুর রহমান বদির ১ লাখ ৩ হাজার ৬২৬ ভোটের বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছিলেন ৭৯ হাজার ৩১০ ভোট। এর আগে নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী মোহাম্মদ আলীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন বিএনপি প্রার্থী শাহাজাহান চৌধুরী। ওই নির্বাচনে শাহজাহান চৌধুরীর প্রাপ্ত ভোট ৮৯ হাজার ৭৪৭ এবং মোহাম্মদ আলীর প্রাপ্ত ভোট ৪৮ হাজার ৭৩৫। এর আগে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৪৪ হাজার ৭০৬ ভোটে নির্বাচিত হন আওয়ামীলীগের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী। ওই নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী ছিলেন শাহজাহান চৌধুরী। তিনি পেয়েছিলেন ৩০ হাজার ৫৯৪ ভোট। ১৯৯১ সালের নির্বাচিত আসনটি নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবারও বিএনপির শাহজাহান চৌধুরী। তিনি পেয়েছিলেন ৩৬ হাজার ৮৭২ ভোট। আর পরাজিত আওয়ামীলীগের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী পেয়েছিলেন ৩৩ হাজার ১৭৬ ভোট।
ফলে আসনটি দক্ষ প্রার্থীর বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী। তিনি জেলা জামায়াতের আমির। টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৪ বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারী আসনটিতে প্রথম বারের মতো সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে জয়ী হতে ৫ আগস্টের পর থেকে মাঠে মাঠে ঘুরছেন। একই সঙ্গে মাঠে রয়েছেন শাহজাহান চৌধুরীও।
বিএনপির প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “উখিয়া–টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। রোহিঙ্গা সংকটের সব চাপ স্থানীয় মানুষের ওপর গিয়ে পড়েছে, অথচ তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয়নি। আমি নির্বাচিত হলে প্রথম কাজ হবে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো।”
তিনি আরও বলেন, “মাদক কারবারে জড়িতদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না। দল-মত নির্বিশেষে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তরুণ সমাজকে বাঁচাতে না পারলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”
উন্নয়ন প্রসঙ্গে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “এই এলাকার মানুষ কর্মসংস্থান চায়, ভিক্ষা নয়। পর্যটন, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলে স্থানীয় যুবকদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।”
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, “দেশের সীমান্তবর্তী এই আসনটি আজ নানা অপরাধ আর অনিয়মের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এর মূল কারণ সুশাসনের অভাব। আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ইনসাফভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।”
রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা আমাদের ভাই, কিন্তু তাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান স্থানীয় মানুষের জন্য সংকট তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “মাদক, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই জামায়াতের রাজনীতি। উখিয়া–টেকনাফকে শান্তি ও নিরাপদ জনপদে পরিণত করাই আমাদের অঙ্গীকার।”