বছর ঘুরে এলো শাবান মাস। ফজিলত ও গুরুত্বের বিচারে এ মাস অত্যন্ত শ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত।হাদীস ভান্ডার এবং বিদগ্ধ মনীষীদের বক্তব্য ও তাদের আলোকোজ্জ্বল জীবন খতিয়ে দেখলে এ বিষয়টি পরিস্ফুটিত হয়।
তবে আফসোস এবং পরিতাপের বিষয় হলো আমরা অনেকেই এ মাসকে তেমন গুরুত্ব দেইনা। নিবিষ্টচিত্তে আমলও করিনা,অথচ মাহে রামাদানের পূর্ণ প্রস্তুতি এবং জীবনকে আলোকিত সুন্দর ও সুসজ্জিত করতে হলে এ মাসকে নফল ইবাদতের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করার বিকল্প নেই।
বিখ্যাত মনীষী ইবনে রজব হাম্বলী রহ.বলেন, ফরজ নামাজের আগে-পরে যেভাবে সুন্নতের বিধান রয়েছে তেমনি রামাদানের আগে-পরে শাবান ও শাওয়ালের রোজার বিধান রয়েছে, মূল বিধানের পরিপূরক।প্রিয় নবীজি তাজদারে মাদীনা এ মাসে খুব বেশি রোজা রাখতেন। হাদিসে এসেছে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাযি.বলেন, আমি রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শাবান মাস অপেক্ষা অন্য কোন মাসে অধিক রোজা রাখতে দেখিনি। (মুসলিম ২৬৯১)
এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি দিক হলো বান্দার আমল সমূহ আলাহর কাছে এ মাসে পেশ করা হয়। হাদিসে পাকে এসেছে নবীজি বলেন, শাবান মাস হলো এমন মাস যে মাসে রাব্বুল আলামিনের কাছে আমল সমূহ পেশ করা হয়, আমি চাই রোজা অবস্থায় আমার আমল সমূহ আল্লাহর দরবারে পেশ করা হোক। (মুসনাদে আহমাদ: ২১৭৫৩, মুসান্নাফ: ৯৮৫৮)
এ মাসের জন্য নবীজি বরকতের দুআ করেছেন। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস রাযি.বলেন নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজব মাস আসলে বলতেন, হে আল্লাহ আপনি রজব এবং শাবান মাসে আমাদের জন্য বারাকাহ দিন এবং আমাদেরকে রামাদান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।
এ মাস পুরোটাই মহিমাময় তবে অর্ধ শাবানের রজনী এ মাসের সর্বশ্রেষ্ট রাত।যাকে আমরা শবে বরাত বলে থাকি, শবে বরাত ফার্সি শব্দ যার অর্থ মুক্তির রাত।বান্দাকে এ মাসে গুনাহ থেকে মুক্তি দেয়া হয় বলে এই নামকরন।
বিখ্যাত সাহাবি হজরত মূআজ ইবনে জাবাল রাযি.থেকে বর্ণিত নবীজি বলেন, অর্ধ শাবানের রজনীতে আল্লাহ সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন অতঃপর শিরককারী ও বিদ্বেষপোষনকারী ছাড়া সমগ্র সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)
শবে বরাতে করনীয়: শবে বরাতে করনীয় সম্পর্কে ইবনে রজব হাম্বলী রহ. চমৎকার বলেছেন, তিনি বলেন, এ রাতে মুমিনগণ আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকবে।বিপদাপদ থেকে মুক্তি প্রার্থনা করবে।
রিজিকের প্রশস্ততা কামনা করবে। তওবার প্রতি মনোনিবেশ করবে।মনে রাখবে আল্লাহর নিকট শিরক,হত্যা ও ব্যভিচার ভয়াবহ অপরাধ। তেমনিভাবে বিদ্বেষ পোষন করা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ভয়াবহ অপরাধ।এ সকল গুনাহ আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বেদআত করা যাবেনা,কেননা এটা মাহরুমীর আলামত।সুন্নাহ সম্মত তরীকায় ইবাদত করবে। (লাতায়েফুল মাআরেফ,পৃ.১৯২-১৯৩)
এ রাতে বর্জনীয় হলো প্রান্তিকতা থেকে বেঁচে থাকা।এ রাতকে ঘিরে নানা ধরনের রসম-রেওয়াজ সমাজে পরিলক্ষিত, হালুয়া রুটি, খিচুড়ি, আতশবাজি, গান বাদ্য বাজিয়ে এলাকা গরম করা ঘরবাড়ি এমনকি মসজিদ আলোকসজ্জা করা ইত্যাদি সবকিছু পরিত্যাজ্য।শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.বলেন এগুলো বিজাতীয় কালচার,হিন্দুদের দেওয়ালী প্রথা থেকে এগুলো মুসলমানদের মাঝে এসেছে,এ ধরনের রসমের কোন স্হান নেই ইসলামে। (মা সাবাতা বিস সুন্নাহ:পৃ.২৩৬-২৩৭)
অতএব এ ধরনের বিদআতি কর্মকাণ্ড থেকে বেঁচে থেকে সঠিক এবং সুন্নাহ সম্মত তরীকায় আমাদের ইবাদতে মগ্ন হতে হবে।কোন অপসংস্কৃতিতে লিপ্ত হয়ে ইমান আমল বিকিয়ে দেয়া যাবেনা।আল্লাহ আমাদের এই মূল্যবান সময়গুলোর যথাযথ গুরুত্বারোপ করার তৌফিক দান করুন।আমিন।